পূর্ব পাকিস্তান: সংশোধিত সংস্করণের মধ্যে পার্থক্য

ভিকিটিয়া থেকে
"{{Infobox former country |conventional_long_name = পূর্ব পাকিস্তান |native_name = {{lang|ur|{{Nastaliq|مشرقی پاکستان}}}} |common_name = পূর্ব পাকিস্তান |status = পাকিস্তানের প্রাক্তন পূর্ব অংশ |p1 = পূর্ববঙ্গ |flag_p1 = Flag of Pakistan.svg |s1 = মুজিবনগর সরকার |flag_s1 = Flag of..." দিয়ে পাতা তৈরি
ট্যাগ: মোবাইল সম্পাদনা মোবাইল ওয়েব সম্পাদনা
 
সম্পাদনা সারাংশ নেই
ট্যাগ: মোবাইল সম্পাদনা মোবাইল ওয়েব সম্পাদনা উচ্চতর মোবাইল সম্পাদনা দৃশ্যমান সম্পাদনা
 
৮ নং লাইন: ৮ নং লাইন:
|s1 = মুজিবনগর সরকার
|s1 = মুজিবনগর সরকার
|flag_s1 = Flag of Bangladesh (1971).svg
|flag_s1 = Flag of Bangladesh (1971).svg
|image_map = Bangladesh on the globe (Bangladesh centered).svg
|image_map = East Bengal Map.gif
|flag_type_article = Flag of Pakistan
|flag_type_article = Flag of Pakistan
|image_flag = Flag of Pakistan.svg
|image_flag = Flag of Pakistan.svg
১৪ নং লাইন: ১৪ নং লাইন:
|symbol = Emblem of East Pakistan
|symbol = Emblem of East Pakistan
|symbol_type = প্রতীক
|symbol_type = প্রতীক
|image_map = East Bengal Map.gif
|capital = [[ঢাকা]]
|capital = [[ঢাকা]]
|common_languages = [[বাংলা ভাষা|বাংলা]] <small>(সরকারি)</small><br>[[বিহারি ভাষা|ভাষা]]<br>[[উর্দু ভাষা|উর্দু]]<br>[[ইংরেজি ভাষা|ইংরেজি]]
|common_languages = [[বাংলা ভাষা|বাংলা]] <small>(সরকারি)</small><br>[[বিহারি ভাষা|ভাষা]]<br>[[উর্দু ভাষা|উর্দু]]<br>[[ইংরেজি ভাষা|ইংরেজি]]
৫৯ নং লাইন: ৫৮ নং লাইন:
|today = {{flagcountry|বাংলাদেশ}}
|today = {{flagcountry|বাংলাদেশ}}
}}
}}
'''পূর্ব পাকিস্তান''' ({{lang-ur|{{Nastaliq|مشرقی پاکستان}}}} {{transl|ur|ALA-LC|''Mas&#x331;h&#x331;riqī Pākistān''}} {{IPA-hns|məʃrɪqiː pɑːkɪst̪ɑːn|IPA}}) ছিল ১৯৫৫ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত [[পাকিস্তান|পাকিস্তানের]] পূর্ব অঙ্গ যা ১৯৭১-এ স্বাধীন রাষ্ট্র [[বাংলাদেশ]] হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৫ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের নাম ছিল [[পূর্ববঙ্গ]]। ১৯৪৭ সালে [[ব্রিটিশ ভারত]] বিভক্ত করে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয় যথা [[ভারত]] ও [[পাকিস্তান]]। [[মুসলিম]] আধিক্যের ভিত্তিতে পাকিস্তানের সীমানা চিহ্নিত করা হয় যার ফলে পাকিস্তানের মানচিত্রে দুটি পৃথক অঞ্চল অনিবার্য হয়ে ওঠে। তৎকালীন [[পূর্ব বঙ্গ]] তথা বর্তমান বাংলাদেশ নিয়ে গঠিত যার একটি পূর্ব পাকিস্তান এবং অপরটি [[পশ্চিম পাকিস্তান]]। পূর্ব পাকিস্তান গঠিত হয়েছিল প্রধানত পূর্ব বঙ্গ নিয়ে যা বর্তমানের বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মানুষ ১৯৪৭-১৯৭১ এই সময়কে পাকিস্তান আমল হিসাবে উল্লেখ করে থাকে।
'''পূর্ব পাকিস্তান''' ছিল ১৯৫৫ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত [[পাকিস্তান|পাকিস্তানের]] পূর্ব অঙ্গ যা ১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র [[বাংলাদেশ]] হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৫ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের নাম ছিল [[পূর্ববঙ্গ]]। ১৯৪৭ সালে [[ব্রিটিশ ভারত]] বিভক্ত করে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয় যথা [[ভারত]] ও [[পাকিস্তান]]। [[মুসলিম]] আধিক্যের ভিত্তিতে পাকিস্তানের সীমানা চিহ্নিত করা হয় যার ফলে পাকিস্তানের মানচিত্রে দুটি পৃথক অঞ্চল অনিবার্য হয়ে ওঠে। তৎকালীন [[পূর্ব বঙ্গ]] তথা বর্তমান বাংলাদেশ নিয়ে গঠিত যার একটি পূর্ব পাকিস্তান এবং অপরটি [[পশ্চিম পাকিস্তান]]। পূর্ব পাকিস্তান গঠিত হয়েছিল প্রধানত পূর্ব বঙ্গ নিয়ে যা বর্তমানের বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মানুষ ১৯৪৭-১৯৭১ এই সময়কে পাকিস্তান আমল হিসাবে উল্লেখ করে থাকে।


১৯৫০ সালে ভূমি সংস্কারের অধীনে ব্রিটিশ আমলে প্রবর্তিত [[জমিদার]] ব্যবস্থা রদ করা হয়।;<ref>Baxter, pp. 72</ref> কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত গুরুত্ব সত্ত্বেও পাকিস্তান সরকার ও সেনাবাহিনী পশ্চিম পাকিস্তানিদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল। ১৯৫২ সালের [[বাংলা ভাষা আন্দোলন|ভাষা আন্দোলন]] পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে সংঘাতের প্রথম লক্ষণ হিসাবে প্রকাশ পায়।<ref>Baxter, pp. 62—63</ref> পরবর্তী দশক জুড়ে কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ে নেয়া নানা পদক্ষেপে পূর্ব পাকিস্তানে সাধারণ মানুষের মনে বিক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে।
১৯৫০ সালে ভূমি সংস্কারের অধীনে ব্রিটিশ আমলে প্রবর্তিত [[জমিদার]] ব্যবস্থা রদ করা হয়।<ref>Baxter, pp. 72</ref> পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত গুরুত্ব সত্ত্বেও পাকিস্তান সরকার ও সেনাবাহিনী পশ্চিম পাকিস্তানিদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল। ১৯৫২ সালের [[বাংলা ভাষা আন্দোলন|ভাষা আন্দোলন]] পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে সংঘাতের প্রথম লক্ষণ হিসাবে প্রকাশ পায়।<ref>Baxter, pp. 62—63</ref> পরবর্তী দশক জুড়ে কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ে নেয়া নানা পদক্ষেপে পূর্ব পাকিস্তানে সাধারণ মানুষের মনে বিক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে।


পশ্চিম পাকিস্তানের প্রভাব ও স্বৈর দৃষ্টিভঙ্গীর বিরূদ্ধে প্রথম পদক্ষেপ ছিল [[মাওলানা ভাসানী|মাওলানা ভাসানীর]] নেতৃত্বে [[আওয়ামী মুসলিম লীগ|আওয়ামী মুসলিম লীগের]] প্রতিষ্ঠা। ১৯৪৯ সালে এই দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নিবার্চনে বিজয় এবং ১৯৬৫ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসক জেনারেল আইয়ুব খানকে পরাজিত করার লক্ষ্য নিয়ে [[সম্মিলিত বিরোধী দল (কপ)|সম্মিলিত বিরোধী দল]] বা 'কপ'-প্রতিষ্ঠা ছিল পাকিস্তানি সামরিক শাসনের বিরূদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানি রাজনীতিবিদদের নেতৃত্বমূলক আন্দোলনের মাইলফলক। পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকারের প্রশ্ন ১৯৫০-এর মধ্যভাগ থেকে উচ্চারিত হতে থাকে। ১৯৬০ দশকের মাঝামাঝি থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ধারণাটি প্রকৃষ্ট হতে শুরু করে। ১৯৬৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান<nowiki/>কে বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগে [[আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা]] দায়ের করা হয়। ১৯৬৯-এ [[আইয়ুব খান|আইয়ুব খানের]] পতন হয় তবে সামরিক শাসন অব্যাহত থাকে। ১৯৭০-এ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। [[আওয়ামী লীগ]] নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে এবং পাকিস্তানে একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনৈতিকদের ষড়যন্ত্রের কারণে প্রেসিডেন্ট জেনারেল [[ইয়াহিয়া খান]] [[শেখ মুজিবুর রহমান|শেখ মুজিবের]] নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর থেকে বিরত থাকেন।
পশ্চিম পাকিস্তানের প্রভাব ও স্বৈর দৃষ্টিভঙ্গীর বিরূদ্ধে প্রথম পদক্ষেপ ছিল [[মাওলানা ভাসানী|মাওলানা ভাসানীর]] নেতৃত্বে [[আওয়ামী মুসলিম লীগ|আওয়ামী মুসলিম লীগের]] প্রতিষ্ঠা। ১৯৪৯ সালে এই দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নিবার্চনে বিজয় এবং ১৯৬৫ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসক জেনারেল আইয়ুব খানকে পরাজিত করার লক্ষ্য নিয়ে [[সম্মিলিত বিরোধী দল (কপ)|সম্মিলিত বিরোধী দল]] বা 'কপ'-প্রতিষ্ঠা ছিল পাকিস্তানি সামরিক শাসনের বিরূদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানি রাজনীতিবিদদের নেতৃত্বমূলক আন্দোলনের মাইলফলক। পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকারের প্রশ্ন ১৯৫০-এর মধ্যভাগ থেকে উচ্চারিত হতে থাকে। ১৯৬০ দশকের মাঝামাঝি থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ধারণাটি প্রকৃষ্ট হতে শুরু করে। ১৯৬৯ সালে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগে [[আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা]] দায়ের করা হয়। ১৯৬৯ সালে [[আইয়ুব খান|আইয়ুব খানের]] পতন হয় তবে সামরিক শাসন অব্যাহত থাকে। ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। [[বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ|আওয়ামী লীগ]] এই নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে এবং পাকিস্তানে একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনৈতিকদের ষড়যন্ত্রের কারণে প্রেসিডেন্ট জেনারেল [[ইয়াহিয়া খান]] [[শেখ মুজিবুর রহমান|শেখ মুজিবুর রহমান]] নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর থেকে বিরত থাকেন।


== ইতিহাস ==
==ইতিহাস==
পূর্ব পাকিস্তানের ইতিহাস মূলতঃ পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের হাতে নিগ্রহ ও শোষণের ইতিহাস যার অন্য পিঠে ছিল ১৯৫৮ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সামরিক শাসন।
পূর্ব পাকিস্তানের ইতিহাস মূলতঃ পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের হাতে নিগ্রহ ও শোষণের ইতিহাস যার অন্য পিঠে ছিল ১৯৫৮ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সামরিক শাসন।


===পশ্চিম পাকিস্তানিদের বৈষম্যমূলক আচরণ===
===পশ্চিম পাকিস্তানিদের বৈষম্যমূলক আচরণ===


=== অর্থনৈতিক বৈষম্য ===
===অর্থনৈতিক বৈষম্য===
পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল। মোট জাতীয় বাজেটের সিংহভাগ বরাদ্দ থাকত পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য।<ref>পাকিস্তানের পরিকল্পনা কমিশন কর্তৃক প্রকাশিত চতুর্থ মেয়াদী পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার জন্য উপদেষ্টা প্যানেলের রিপোর্ট।</ref>
পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল। মোট জাতীয় বাজেটের সিংহভাগ বরাদ্দ থাকত পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য।<ref>পাকিস্তানের পরিকল্পনা কমিশন কর্তৃক প্রকাশিত চতুর্থ মেয়াদী পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার জন্য উপদেষ্টা প্যানেলের রিপোর্ট।</ref>
{| style="width:50%; allign:center;" border="1"
{| style="width:50%; allign:center;" border="1"
|+
|+
!বছর!!পশ্চিম পাকিস্তানের প্রাক্কলিন ব্যয় (রুপী কোটিতে)!!পূর্ব পাকিস্তানের প্রাক্কলিন ব্যয় (রুপী কোটিতে)!! পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় পূর্ব পাকিস্তানে ব্যয়ের শতকরা পরিমাণ
!বছর!!পশ্চিম পাকিস্তানের প্রাক্কলিন ব্যয় (রুপী কোটিতে)!!পূর্ব পাকিস্তানের প্রাক্কলিন ব্যয় (রুপী কোটিতে)!!পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় পূর্ব পাকিস্তানে ব্যয়ের শতকরা পরিমাণ
|-
|-
|১৯৫০-৫৫
|১৯৫০-৫৫
১২৮ নং লাইন: ১২৭ নং লাইন:
|}
|}


=== ভাষা আন্দোলন ===
===ভাষা আন্দোলন===
{{মূল নিবন্ধ|বাংলা ভাষা আন্দোলন}}
{{মূল নিবন্ধ|বাংলা ভাষা আন্দোলন}}
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পটভূমি অনুসন্ধান করে দেখা যায় [[১৯৪৭]] সালে পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই শুরু হয় পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণমূলক আচরণ। কেবল অর্থনৈতিক শোষণ নয়, বাঙ্গালী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ওপরও নিপীড়ন শুরু হয় এবং এর প্রথম দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয় যখন পাকিস্তানের জনক [[মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ]] ঢাকায় এসে ঘোষণা দেন "উর্দু এবং কেবলমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা"। সাথে সাথে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালীরা এই ঘোষণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ভাষার জন্যে এই আন্দোলন তীব্রতম রূপ ধারণ করে। এদিন পুলিশের গুলিতে মারা যান সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার সহ আরো অনেকে। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীকে শেষ পর্যন্ত ১৯৫৬ সালে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিতে হয়। আজ পৃথিবীব্যাপী ২১শে ফেব্রুয়ারি [[আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস]] হিসেবে পালিত হয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পটভূমি অনুসন্ধান করে দেখা যায় [[১৯৪৭]] সালে পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই শুরু হয় পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণমূলক আচরণ। কেবল অর্থনৈতিক শোষণ নয়, বাঙ্গালী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ওপরও নিপীড়ন শুরু হয় এবং এর প্রথম দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয় যখন পাকিস্তানের জনক [[মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ]] ঢাকায় এসে ঘোষণা দেন "উর্দু এবং কেবলমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা"। সাথে সাথে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালীরা এই ঘোষণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ভাষার জন্যে এই আন্দোলন তীব্রতম রূপ ধারণ করে। এদিন পুলিশের গুলিতে মারা যান সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার সহ আরো অনেকে। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীকে শেষ পর্যন্ত ১৯৫৬ সালে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিতে হয়। আজ পৃথিবীব্যাপী ২১শে ফেব্রুয়ারি [[আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস]] হিসেবে পালিত হয়।


=== সামরিক বৈষম্য ===
===সামরিক বৈষম্য===


পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীতে [[বাঙালি জাতি|বাঙালিরা]] অবহেলিত ছিল। পাকিস্তানি সশস্ত্রবাহিনীর কর্মকর্তাদের মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশ ছিলেন বাঙালি এবং এঁদের মধ্যে অধিকাংশই প্রযুক্তিগত বা ব্যবস্থাপনার পদে ছিলেন। খুব অল্প সংখ্যক বাঙালি অফিসার আদেশদানকারী পদ লাভের সুযোগ পেতেন। পশ্চিম পাকিস্তানিরা বিশ্বাস করত বাঙালিরা পশতুন বা পাঞ্জাবিদের মত "সাহসী" নয়। পাকিস্তানের বাজেটের একটি বিশাল অংশ সামরিক খাতে বরাদ্দ থাকলেও পূর্ব পাকিস্তান এর সুফল সামান্যই পেত। ১৯৬৫ সালে কাশ্মীর নিয়ে [[ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ ১৯৬৫|ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ]] পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি আরো বাড়িয়ে দেয়।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীতে [[বাঙালি জাতি|বাঙালিরা]] অবহেলিত ছিল। পাকিস্তানি সশস্ত্রবাহিনীর কর্মকর্তাদের মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশ ছিলেন বাঙালি এবং এঁদের মধ্যে অধিকাংশই প্রযুক্তিগত বা ব্যবস্থাপনার পদে ছিলেন। খুব অল্প সংখ্যক বাঙালি অফিসার আদেশদানকারী পদ লাভের সুযোগ পেতেন। পশ্চিম পাকিস্তানিরা বিশ্বাস করত বাঙালিরা পশতুন বা পাঞ্জাবিদের মত "সাহসী" নয়। পাকিস্তানের বাজেটের একটি বিশাল অংশ সামরিক খাতে বরাদ্দ থাকলেও পূর্ব পাকিস্তান এর সুফল সামান্যই পেত। ১৯৬৫ সালে কাশ্মীর নিয়ে [[ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ ১৯৬৫|ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ]] পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি আরো বাড়িয়ে দেয়।


=== রাজনৈতিক অসমতা ===
===রাজনৈতিক অসমতা===
জনসংখ্যার দিক দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তানের বৃহত্তর অংশ হওয়া সত্ত্বেও দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা পশ্চিম পাকিস্তান কুক্ষিগত করে রাখে। জনসংখ্যার ভিত্তিতে ক্ষমতার বণ্টন পূর্ব পাকিস্তানের অনুকূল হওয়ায় পশ্চিম পাকিস্তান '''এক ইউনিট তত্ত্ব''' নামে এক অভিনব ধারণার সূত্রপাত করে, যেখানে সমগ্র পশ্চিম পাকিস্তান একটি প্রদেশ হিসেবে বিবেচিত হয়। এর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিম অংশের ভোটের ভারসাম্য আনা। মজার ব্যাপার হল বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর পাঞ্জাব প্রদেশ প্রস্তাব করে পাকিস্তানে সরাসরি জনসংখ্যার বণ্টনের ভিত্তিতে ভোট অনুষ্ঠিত হোক, কারণ পাঞ্জাবিরা ছিল সিন্ধি, পশতুন, বালুচ বা পাকিস্তানের অন্য যেকোন গোত্রের তুলনায় সংখ্যাগরিষ্ঠ।
জনসংখ্যার দিক দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তানের বৃহত্তর অংশ হওয়া সত্ত্বেও দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা পশ্চিম পাকিস্তান কুক্ষিগত করে রাখে। জনসংখ্যার ভিত্তিতে ক্ষমতার বণ্টন পূর্ব পাকিস্তানের অনুকূল হওয়ায় পশ্চিম পাকিস্তান '''এক ইউনিট তত্ত্ব''' নামে এক অভিনব ধারণার সূত্রপাত করে, যেখানে সমগ্র পশ্চিম পাকিস্তান একটি প্রদেশ হিসেবে বিবেচিত হয়। এর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিম অংশের ভোটের ভারসাম্য আনা। মজার ব্যাপার হল বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর পাঞ্জাব প্রদেশ প্রস্তাব করে পাকিস্তানে সরাসরি জনসংখ্যার বণ্টনের ভিত্তিতে ভোট অনুষ্ঠিত হোক, কারণ পাঞ্জাবিরা ছিল সিন্ধি, পশতুন, বালুচ বা পাকিস্তানের অন্য যেকোন গোত্রের তুলনায় সংখ্যাগরিষ্ঠ।


১৪৪ নং লাইন: ১৪৩ নং লাইন:


১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু [[শেখ মুজিবুর রহমান]] ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান [[সোহরাওয়ার্দী উদ্যান]]) এক ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। এই ভাষণে তিনি ২৫শে মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের আগে চার দফা দাবি পেশ করেন:
১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু [[শেখ মুজিবুর রহমান]] ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান [[সোহরাওয়ার্দী উদ্যান]]) এক ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। এই ভাষণে তিনি ২৫শে মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের আগে চার দফা দাবি পেশ করেন:
* অবিলম্বে মার্শাল ল' প্রত্যাহার করতে হবে।
*অবিলম্বে মার্শাল ল' প্রত্যাহার করতে হবে।
* সামরিক বাহিনীকে ব্যারাকে ফিরে যেতে হবে।
*সামরিক বাহিনীকে ব্যারাকে ফিরে যেতে হবে।
* নিহত ব্যক্তিদের সঠিক সংখ্যা অনুসন্ধান করতে হবে।
*নিহত ব্যক্তিদের সঠিক সংখ্যা অনুসন্ধান করতে হবে।
* ২৫শে মার্চে জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের আগে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।
*২৫শে মার্চে জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের আগে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।


=== ১৯৭০-এর ঘূর্ণিঝড় ===
===১৯৭০-এর ঘূর্ণিঝড়===


১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর ভোলার ঘূর্ণিঝড় পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রবল জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি করে, সেই সাথে জোয়ারের কারণে প্রায় ৩,০০,০০০ থেকে ৫,০০,০০০ মানুষ প্রাণ হারায়। প্রাণহানির সঠিক সংখ্যা জানা না গেলেও এটিকে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ [[ঘূর্ণিঝড়|হারিকেন]] হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক সরকার এমন ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পরও জরুরি ত্রাণকার্য পরিচালনায় গড়িমসি করে। ঘূর্ণিঝড়ের পরও যারা বেঁচে ছিল তারা মারা যায় খাবার আর পানির অভাবে। ঘূর্ণিঝড়ের এক সপ্তাহ পরে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান স্বীকার করেন যে, সরকার দুর্যোগের ভয়াবহতা বুঝতে না পারার কারণেই ত্রাণকার্য সঠিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। ঘূর্ণিঝড়ে বিপর্যস্ত মানুষগুলোর প্রতি পাকিস্তান সরকারের এমন নিষ্ঠুরতা দেখে পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ২৪ নভেম্বর এক সভায় [[আবদুল হামিদ খান ভাসানী|মাওলানা ভাসানী]] পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অদক্ষতার অভিযোগ তোলেন এবং অবিলম্বে তার পদত্যাগ দাবি করেন। ইতিহাসে প্রথমবারের মত একটি প্রাকৃতিক ঘটনা একটি দেশে গৃহযুদ্ধের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর ভোলার ঘূর্ণিঝড় পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রবল জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি করে, সেই সাথে জোয়ারের কারণে প্রায় ৩,০০,০০০ থেকে ৫,০০,০০০ মানুষ প্রাণ হারায়। প্রাণহানির সঠিক সংখ্যা জানা না গেলেও এটিকে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ [[ঘূর্ণিঝড়|হারিকেন]] হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক সরকার এমন ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পরও জরুরি ত্রাণকার্য পরিচালনায় গড়িমসি করে। ঘূর্ণিঝড়ের পরও যারা বেঁচে ছিল তারা মারা যায় খাবার আর পানির অভাবে। ঘূর্ণিঝড়ের এক সপ্তাহ পরে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান স্বীকার করেন যে, সরকার দুর্যোগের ভয়াবহতা বুঝতে না পারার কারণেই ত্রাণকার্য সঠিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। ঘূর্ণিঝড়ে বিপর্যস্ত মানুষগুলোর প্রতি পাকিস্তান সরকারের এমন নিষ্ঠুরতা দেখে পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ২৪ নভেম্বর এক সভায় [[আবদুল হামিদ খান ভাসানী|মাওলানা ভাসানী]] পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অদক্ষতার অভিযোগ তোলেন এবং অবিলম্বে তার পদত্যাগ দাবি করেন। ইতিহাসে প্রথমবারের মত একটি প্রাকৃতিক ঘটনা একটি দেশে গৃহযুদ্ধের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।


== বাংলাদেশের অভ্যুদয় ==
==বাংলাদেশের অভ্যুদয়==


১৯৭০ সালের ১১ নভেম্বর এক প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ৫ লক্ষ লোকের মৃত্যু ঘটে। এ সময় বাঙালিদের প্রতি পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের অসহযোগিতা ও ঔদাসীন্য প্রকট হয়ে ওঠে। ১৯৭০ সালের সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা করতে থাকে<ref>Baxter, pp. 78—79</ref>। মুজিবের সাথে গোলটেবিল বৈঠক সফল না হওয়ার পর পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জেনারেল ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ গভীর রাতে মুজিবকে গ্রেপ্তার করেন এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের অংশ হিসাবে বাঙালিদের উপর নির্বিচারে আক্রমণ শুরু করে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর এই নারকীয় হামলাযজ্ঞে রাতারাতি বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সেনাবাহিনী ও তার স্থানীয় দালালদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল বুদ্ধিজীবী ও সংখ্যালঘু হিন্দু জনগোষ্ঠী। গণহত্যা থেকে নিস্তার পেতে প্রায় ১ কোটি অসহায় মানুষ দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে আশ্রয় নেয়<ref>LaPorte, pp. 103</ref>। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মোট জীবনহানির সংখ্যার হিসাব কয়েক লক্ষ হতে শুরু করে ৩০ লক্ষ পর্যন্ত অনুমান করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতা [[ভারত|ভারতে]] আশ্রয় নিয়েছিলেন। তারা ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে অস্থায়ী সরকার গঠন করেন। এর প্রধানমন্ত্রী হন তাজউদ্দিন আহমদ। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা প্রায় ৯ মাস পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর বিরূদ্ধে লড়াই করে। [[মুক্তিবাহিনী]] ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ভারতের সহায়তায় ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে পরাভূত করে।ভারতীয় মিত্রবাহিনী প্রধান জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল নিয়াজী ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ করেন। প্রায় ৯০,০০০ পাকিস্তানি সৈন্য যুদ্ধবন্দি হিসেবে আটক হয়; যাদেরকে ১৯৭৩ সালে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হয়। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র বাংলাদেশ গঠন করে।
১৯৭০ সালের ১১ নভেম্বর এক প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ৫ লক্ষ লোকের মৃত্যু ঘটে। এ সময় বাঙালিদের প্রতি পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের অসহযোগিতা ও ঔদাসীন্য প্রকট হয়ে ওঠে। ১৯৭০ সালের সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা করতে থাকে<ref>Baxter, pp. 78—79</ref>। মুজিবের সাথে গোলটেবিল বৈঠক সফল না হওয়ার পর পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জেনারেল ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ গভীর রাতে মুজিবকে গ্রেপ্তার করেন এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের অংশ হিসাবে বাঙালিদের উপর নির্বিচারে আক্রমণ শুরু করে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর এই নারকীয় হামলাযজ্ঞে রাতারাতি বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সেনাবাহিনী ও তার স্থানীয় দালালদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল বুদ্ধিজীবী ও সংখ্যালঘু হিন্দু জনগোষ্ঠী। গণহত্যা থেকে নিস্তার পেতে প্রায় ১ কোটি অসহায় মানুষ দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে আশ্রয় নেয়<ref>LaPorte, pp. 103</ref>। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মোট জীবনহানির সংখ্যার হিসাব কয়েক লক্ষ হতে শুরু করে ৩০ লক্ষ পর্যন্ত অনুমান করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতা [[ভারত|ভারতে]] আশ্রয় নিয়েছিলেন। তারা ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে অস্থায়ী সরকার গঠন করেন। এর প্রধানমন্ত্রী হন তাজউদ্দিন আহমদ। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা প্রায় ৯ মাস পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর বিরূদ্ধে লড়াই করে। [[মুক্তিবাহিনী]] ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ভারতের সহায়তায় ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে পরাভূত করে।ভারতীয় মিত্রবাহিনী প্রধান জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল নিয়াজী ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ করেন। প্রায় ৯০,০০০ পাকিস্তানি সৈন্য যুদ্ধবন্দি হিসেবে আটক হয়; যাদেরকে ১৯৭৩ সালে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হয়। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র বাংলাদেশ গঠন করে।
== আরও দেখুন ==
==আরও দেখুন==
* [[পাকবাংলা ভাষা]]
*[[পাকবাংলা ভাষা]]


== তথ্যসূত্র ==
==তথ্যসূত্র==
{{সূত্র তালিকা}}
{{সূত্র তালিকা}}


== বহিঃসংযোগ ==
==বহিঃসংযোগ==
{{উইকিউক্তি}}
{{উইকিউক্তি}}
* [http://www.bangladesh.gov.bd বাংলাদেশ সরকার]
*[http://www.bangladesh.gov.bd বাংলাদেশ সরকার]
* {{en}} [http://www.pakistan.gov.pk পাকিস্তান সরকার]
*{{en}} [http://www.pakistan.gov.pk পাকিস্তান সরকার]


{{পাকিস্তান আন্দোলন}}
{{পাকিস্তান আন্দোলন}}

১৪:০১, ৪ জুন ২০২৫ তারিখে সম্পাদিত সর্বশেষ সংস্করণ

টেমপ্লেট:Infobox former country পূর্ব পাকিস্তান ছিল ১৯৫৫ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত পাকিস্তানের পূর্ব অঙ্গ যা ১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৫ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের নাম ছিল পূর্ববঙ্গ। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত বিভক্ত করে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয় যথা ভারতপাকিস্তানমুসলিম আধিক্যের ভিত্তিতে পাকিস্তানের সীমানা চিহ্নিত করা হয় যার ফলে পাকিস্তানের মানচিত্রে দুটি পৃথক অঞ্চল অনিবার্য হয়ে ওঠে। তৎকালীন পূর্ব বঙ্গ তথা বর্তমান বাংলাদেশ নিয়ে গঠিত যার একটি পূর্ব পাকিস্তান এবং অপরটি পশ্চিম পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তান গঠিত হয়েছিল প্রধানত পূর্ব বঙ্গ নিয়ে যা বর্তমানের বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মানুষ ১৯৪৭-১৯৭১ এই সময়কে পাকিস্তান আমল হিসাবে উল্লেখ করে থাকে।

১৯৫০ সালে ভূমি সংস্কারের অধীনে ব্রিটিশ আমলে প্রবর্তিত জমিদার ব্যবস্থা রদ করা হয়।[১] পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত গুরুত্ব সত্ত্বেও পাকিস্তান সরকার ও সেনাবাহিনী পশ্চিম পাকিস্তানিদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে সংঘাতের প্রথম লক্ষণ হিসাবে প্রকাশ পায়।[২] পরবর্তী দশক জুড়ে কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ে নেয়া নানা পদক্ষেপে পূর্ব পাকিস্তানে সাধারণ মানুষের মনে বিক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে।

পশ্চিম পাকিস্তানের প্রভাব ও স্বৈর দৃষ্টিভঙ্গীর বিরূদ্ধে প্রথম পদক্ষেপ ছিল মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা। ১৯৪৯ সালে এই দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নিবার্চনে বিজয় এবং ১৯৬৫ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসক জেনারেল আইয়ুব খানকে পরাজিত করার লক্ষ্য নিয়ে সম্মিলিত বিরোধী দল বা 'কপ'-প্রতিষ্ঠা ছিল পাকিস্তানি সামরিক শাসনের বিরূদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানি রাজনীতিবিদদের নেতৃত্বমূলক আন্দোলনের মাইলফলক। পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকারের প্রশ্ন ১৯৫০-এর মধ্যভাগ থেকে উচ্চারিত হতে থাকে। ১৯৬০ দশকের মাঝামাঝি থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ধারণাটি প্রকৃষ্ট হতে শুরু করে। ১৯৬৯ সালে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয়। ১৯৬৯ সালে আইয়ুব খানের পতন হয় তবে সামরিক শাসন অব্যাহত থাকে। ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে এবং পাকিস্তানে একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনৈতিকদের ষড়যন্ত্রের কারণে প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানশেখ মুজিবুর রহমান নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর থেকে বিরত থাকেন।

ইতিহাস

পূর্ব পাকিস্তানের ইতিহাস মূলতঃ পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের হাতে নিগ্রহ ও শোষণের ইতিহাস যার অন্য পিঠে ছিল ১৯৫৮ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সামরিক শাসন।

পশ্চিম পাকিস্তানিদের বৈষম্যমূলক আচরণ

অর্থনৈতিক বৈষম্য

পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল। মোট জাতীয় বাজেটের সিংহভাগ বরাদ্দ থাকত পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য।[৩]

বছর পশ্চিম পাকিস্তানের প্রাক্কলিন ব্যয় (রুপী কোটিতে) পূর্ব পাকিস্তানের প্রাক্কলিন ব্যয় (রুপী কোটিতে) পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় পূর্ব পাকিস্তানে ব্যয়ের শতকরা পরিমাণ
১৯৫০-৫৫ ১,১২৯ ৫২৪ ৪৬.৪
১৯৫৫-৬০ ১,৬৫৫ ৫২৪ ৩১.৭
১৯৬০-৬৫ ৩,৩৫৫ ১,৪০৪ ৪১.৮
১৯৬৫-৭০ ৫,১৯৫ ২,১৪১ ৪১.২
মোট ১১,৩৩৪ ৪,৫৯৩ ৪০.৫

১৯৭০ সালে নির্বাচনের একটি পোস্টারে অর্থনৈতিক বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরা হয়।

বৈষম্য বিষয় বাংলাদেশ পশ্চিম পাকিস্তান
রাজস্ব খাতে ব্যয় ১৫০০ কোটি টাকা ৫০০০ কোটি টাকা
উন্নয়ন খাতে ব্যয় ৩০০০ কোটি টাকা ৬০০০ কোটি টাকা
বৈদেশিক সাহায্য শতকরা ২০ ভাগ শতকরা ৮০ ভাগ
বৈদেশিক দ্রব্য আমদানী শতকরা ২৫ ভাগ শতকরা ৭৫ ভাগ
কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরি শতকরা ১৫ জন শতকরা ৮৫ জন
সামরিক বিভাগে চাকরি শতকরা ১০ জন শতকরা ৯০ জন
চাউল (মণ প্রতি) ৫০ টাকা ২৫ টাকা
আটা (মণ প্রতি) ৩০ টাকা ১৫ টাকা
সরিষার তৈল (সের প্রতি) ৫ টাকা ২.৫০পয়সা
স্বর্ণ প্রতি ভরি ১৭০ টাকা ১৩৫ টাকা

ভাষা আন্দোলন

টেমপ্লেট:মূল নিবন্ধ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পটভূমি অনুসন্ধান করে দেখা যায় ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই শুরু হয় পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণমূলক আচরণ। কেবল অর্থনৈতিক শোষণ নয়, বাঙ্গালী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ওপরও নিপীড়ন শুরু হয় এবং এর প্রথম দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয় যখন পাকিস্তানের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় এসে ঘোষণা দেন "উর্দু এবং কেবলমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা"। সাথে সাথে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালীরা এই ঘোষণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ভাষার জন্যে এই আন্দোলন তীব্রতম রূপ ধারণ করে। এদিন পুলিশের গুলিতে মারা যান সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার সহ আরো অনেকে। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীকে শেষ পর্যন্ত ১৯৫৬ সালে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিতে হয়। আজ পৃথিবীব্যাপী ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়।

সামরিক বৈষম্য

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীতে বাঙালিরা অবহেলিত ছিল। পাকিস্তানি সশস্ত্রবাহিনীর কর্মকর্তাদের মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশ ছিলেন বাঙালি এবং এঁদের মধ্যে অধিকাংশই প্রযুক্তিগত বা ব্যবস্থাপনার পদে ছিলেন। খুব অল্প সংখ্যক বাঙালি অফিসার আদেশদানকারী পদ লাভের সুযোগ পেতেন। পশ্চিম পাকিস্তানিরা বিশ্বাস করত বাঙালিরা পশতুন বা পাঞ্জাবিদের মত "সাহসী" নয়। পাকিস্তানের বাজেটের একটি বিশাল অংশ সামরিক খাতে বরাদ্দ থাকলেও পূর্ব পাকিস্তান এর সুফল সামান্যই পেত। ১৯৬৫ সালে কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি আরো বাড়িয়ে দেয়।

রাজনৈতিক অসমতা

জনসংখ্যার দিক দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তানের বৃহত্তর অংশ হওয়া সত্ত্বেও দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা পশ্চিম পাকিস্তান কুক্ষিগত করে রাখে। জনসংখ্যার ভিত্তিতে ক্ষমতার বণ্টন পূর্ব পাকিস্তানের অনুকূল হওয়ায় পশ্চিম পাকিস্তান এক ইউনিট তত্ত্ব নামে এক অভিনব ধারণার সূত্রপাত করে, যেখানে সমগ্র পশ্চিম পাকিস্তান একটি প্রদেশ হিসেবে বিবেচিত হয়। এর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিম অংশের ভোটের ভারসাম্য আনা। মজার ব্যাপার হল বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর পাঞ্জাব প্রদেশ প্রস্তাব করে পাকিস্তানে সরাসরি জনসংখ্যার বণ্টনের ভিত্তিতে ভোট অনুষ্ঠিত হোক, কারণ পাঞ্জাবিরা ছিল সিন্ধি, পশতুন, বালুচ বা পাকিস্তানের অন্য যেকোন গোত্রের তুলনায় সংখ্যাগরিষ্ঠ।

একেবারে শুরু থেকেই পাকিস্তানে শাসনের নামে ষড়যন্ত্র শুরু হয়, আর এই ষড়যন্ত্রে মূল ভূমিকা পালন করে সামরিক বাহিনী। যখনই পূর্ব পাকিস্তানের কোন নেতা, যেমন খাজা নাজিমুদ্দিন, মোহাম্মদ আলী বগুড়া, অথবা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হতেন, তখনই পশ্চিম পাকিস্তানিরা কোন না কোন অজুহাতে তাদের পদচ্যুত করত। নানারকম টালবাহানা করে জেনারেল আইয়ুব খান ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতা দখল করে নেন এবং দীর্ঘ ১১ বছর ধরে পাকিস্তানে তার স্বৈরতান্ত্রিক শাসন চালু থাকে। পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের এই অনৈতিক ক্ষমতা দখল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়েই চলে।

পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি চূড়ান্ত নাটকীয়তার মুখোমুখি হয় যখন ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় দল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। দলটি পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯ টি আসন হতে ১৬৭ টি আসনে জয়লাভ করে এবং ৩১৩ আসনবিশিষ্ট জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, যা আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনের অধিকার প্রদান করে। কিন্তু নির্বাচনে দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাপ্রাপ্ত দল পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো শেখ মুজিবের পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বিরোধিতা করেন। তিনি প্রস্তাব করেন পাকিস্তানের দুই প্রদেশের জন্যে থাকবে দু'জন প্রধানমন্ত্রী। "এক ইউনিট কাঠামো" নিয়ে ক্ষুব্ধ পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মধ্যে এরূপ অভিনব প্রস্তাব নতুন করে ক্ষোভের সঞ্চার করে। ভুট্টো এমনকি মুজিবের ৬-দফা দাবি মেনে নিতেও অস্বীকৃতি প্রকাশ করেন। মার্চের ৩ তারিখ পূর্ব ও পশ্চিম অংশের এই দুই নেতা পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টকে সঙ্গে নিয়ে দেশের ভাগ্য নির্ধারণে ঢাকায় বৈঠকে মিলিত হন। তবে বৈঠক ফলপ্রসূ হয় না। মুজিব সারা দেশে ধর্মঘটের ডাক দেন।

১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। এই ভাষণে তিনি ২৫শে মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের আগে চার দফা দাবি পেশ করেন:

  • অবিলম্বে মার্শাল ল' প্রত্যাহার করতে হবে।
  • সামরিক বাহিনীকে ব্যারাকে ফিরে যেতে হবে।
  • নিহত ব্যক্তিদের সঠিক সংখ্যা অনুসন্ধান করতে হবে।
  • ২৫শে মার্চে জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের আগে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।

১৯৭০-এর ঘূর্ণিঝড়

১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর ভোলার ঘূর্ণিঝড় পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রবল জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি করে, সেই সাথে জোয়ারের কারণে প্রায় ৩,০০,০০০ থেকে ৫,০০,০০০ মানুষ প্রাণ হারায়। প্রাণহানির সঠিক সংখ্যা জানা না গেলেও এটিকে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ হারিকেন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক সরকার এমন ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পরও জরুরি ত্রাণকার্য পরিচালনায় গড়িমসি করে। ঘূর্ণিঝড়ের পরও যারা বেঁচে ছিল তারা মারা যায় খাবার আর পানির অভাবে। ঘূর্ণিঝড়ের এক সপ্তাহ পরে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান স্বীকার করেন যে, সরকার দুর্যোগের ভয়াবহতা বুঝতে না পারার কারণেই ত্রাণকার্য সঠিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। ঘূর্ণিঝড়ে বিপর্যস্ত মানুষগুলোর প্রতি পাকিস্তান সরকারের এমন নিষ্ঠুরতা দেখে পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ২৪ নভেম্বর এক সভায় মাওলানা ভাসানী পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অদক্ষতার অভিযোগ তোলেন এবং অবিলম্বে তার পদত্যাগ দাবি করেন। ইতিহাসে প্রথমবারের মত একটি প্রাকৃতিক ঘটনা একটি দেশে গৃহযুদ্ধের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশের অভ্যুদয়

১৯৭০ সালের ১১ নভেম্বর এক প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ৫ লক্ষ লোকের মৃত্যু ঘটে। এ সময় বাঙালিদের প্রতি পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের অসহযোগিতা ও ঔদাসীন্য প্রকট হয়ে ওঠে। ১৯৭০ সালের সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা করতে থাকে[৪]। মুজিবের সাথে গোলটেবিল বৈঠক সফল না হওয়ার পর পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জেনারেল ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ গভীর রাতে মুজিবকে গ্রেপ্তার করেন এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের অংশ হিসাবে বাঙালিদের উপর নির্বিচারে আক্রমণ শুরু করে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর এই নারকীয় হামলাযজ্ঞে রাতারাতি বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সেনাবাহিনী ও তার স্থানীয় দালালদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল বুদ্ধিজীবী ও সংখ্যালঘু হিন্দু জনগোষ্ঠী। গণহত্যা থেকে নিস্তার পেতে প্রায় ১ কোটি অসহায় মানুষ দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে আশ্রয় নেয়[৫]। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মোট জীবনহানির সংখ্যার হিসাব কয়েক লক্ষ হতে শুরু করে ৩০ লক্ষ পর্যন্ত অনুমান করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতা ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তারা ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে অস্থায়ী সরকার গঠন করেন। এর প্রধানমন্ত্রী হন তাজউদ্দিন আহমদ। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা প্রায় ৯ মাস পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর বিরূদ্ধে লড়াই করে। মুক্তিবাহিনী ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ভারতের সহায়তায় ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে পরাভূত করে।ভারতীয় মিত্রবাহিনী প্রধান জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল নিয়াজী ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ করেন। প্রায় ৯০,০০০ পাকিস্তানি সৈন্য যুদ্ধবন্দি হিসেবে আটক হয়; যাদেরকে ১৯৭৩ সালে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হয়। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র বাংলাদেশ গঠন করে।

আরও দেখুন

তথ্যসূত্র

  1. Baxter, pp. 72
  2. Baxter, pp. 62—63
  3. পাকিস্তানের পরিকল্পনা কমিশন কর্তৃক প্রকাশিত চতুর্থ মেয়াদী পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার জন্য উপদেষ্টা প্যানেলের রিপোর্ট।
  4. Baxter, pp. 78—79
  5. LaPorte, pp. 103

বহিঃসংযোগ

টেমপ্লেট:উইকিউক্তি

টেমপ্লেট:পাকিস্তান আন্দোলন টেমপ্লেট:বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক