কয়রা উপজেলা
কয়রা উপজেলা বাংলাদেশের খুলনা জেলার একটি প্রশাসনিক এলাকা। ১৭৭৫.৪১ বর্গকিলোমিটার আয়তন নিয়ে এটি বাংলাদেশের ২য় বৃহত্তম উপজেলা।খুলনা জেলার দক্ষিণের জনপদটি বর্তমানে এগিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করে।পৃথিবী বিখ্যাত বা বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন এর কোল ঘেষে গড়ে ওঠা এই উপজেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেশের অন্যান্য উপজেলা থেকে আলাদা এবং মনোমুগ্ধকর।উপজেলাটির দক্ষিণে রয়েছে বঙ্গোপসাগরের নয়নাভিরাম সমুদ্র সৈকত।শিক্ষার হার বাড়ার সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা নিরবিচ্ছিন্ন থাকায় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিও আসছে কয়রায়।এছাড়া কয়রা উপজেলার অন্যতম অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্য হলো মৎস্য শিল্প বা চিংড়ি চাষ যার কারণে কয়রা উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় বড় বড় ঘের কিংবা জলাধার দেখা যায়।কয়রার মানুষ দেশ ও দেশের বাইরে সফলতার স্বাক্ষর রেখে এগিয়ে চলেছে।বর্তমানে সরকারের উদ্যোগে কয়রায় বড় পর্যটন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অবস্থান ও আয়তন
কয়রার ভৌগোলিক অবস্থান টেমপ্লেট:স্থানাঙ্ক। এখানে ২৮০৬১ পরিবারের ইউনিট রয়েছে এবং মোট এলাকা ১৭৭৫,৪১ কিমি²। উত্তরে পাইকগাছা উপজেলা, দক্ষিণ বঙ্গোপসাগর ও সুন্দরবন, পূর্বে দাকোপ উপজেলা, পশ্চিমে সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলা ও আশাশুনি উপজেলা।
ইতিহাস
কয়রা উপজেলা খুলনার সবচেয়ে দক্ষিণের একমাত্র উপজেলা। কয়রা থানা গঠিত হয় ১৯৮০ সালে এবং থানাকে উপজেলায় রূপান্তর করা হয় ১৯৮৩ সালে। কয়রা থানা গঠন করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হুসাইন মোহাম্মাদ এরশাদ।
মুক্তিযুদ্ধ
মুক্তিযুদ্ধের সময় কয়রা উপজেলা ৯নং সেক্টরের অধীন ছিল। এখানে ৯ নং সাব-সেক্টর হেডকোয়ার্টার স্থাপিত হয়েছিল যেটা আমাদী ইউনিয়নে বাছাড়বাড়ি-মনোরঞ্জন ক্যাম্প নামে সুপরিচিত এবং এখান থেকেই মুক্তিবাহিনী ও মুজিববাহিনীর মোট ২৩টি ক্যাম্প ও অধিকাংশ অভিযান পরিচালিত হতো। স্থানীয়ভাবে এ উপজেলায় মোট পাঁচটি ক্যাম্প গড়ে তোলা হয়। তা হলো, আমাদী ইউনিয়নের বিশ্বকবি ক্যাম্প (পরিচালনায়ঃ মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফ),নাজমুল ক্যাম্প (পরিচালনায়ঃ মুক্তিযোদ্ধা কে, এম, মুজিবর রহমান), নজরুল ক্যাম্প (পরিচালনায়ঃ মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাকিম), কয়রা ইউনিয়নের ঝিলেঘাটা গ্রামে শহীদ নারায়ণ ক্যাম্প (পরিচালনায়ঃ মুক্তিযোদ্ধা কেরামত আলী, শেখ আবদুল জলিল ও শামছুর রহমান) ও বাগালি ইউনিয়নের বামিয়া গ্রামে শহীদ সোহরাওয়ার্দী ক্যাম্প (পরিচালনায়ঃ মুক্তিযোদ্ধা রেজাউল করিম)। আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে ডাঃ রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে জায়গীরমহলে গঠিত গোপন চিকিৎসা কেন্দ্রটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ।মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্নযুক্ত বধ্যভূমি ১ (কয়রা ৪ নং লঞ্চঘাট এলাকায় মড়িঘাটা) রয়েছে।
প্রশাসনিক এলাকা
কয়রায় রয়েছে ৭টি ইউনিয়ন, ৭২টি মৌজা/মহল্লা এবং ১৩১ টি গ্রাম। ইউনিয়নগুলি হল:
জনসংখ্যার উপাত্ত
১৯৯১ সালের বাংলাদেশের আদমশুমারি এর হিসাব অনুযায়ী, কয়রার ১৬৫.৪৭৩ জনসংখ্যা রয়েছে। পুরুষদের জনসংখ্যার ৪৯.৬৮% এবং নারী ৫০.৩২%। এই উপজেলার আঠারো বছর পর্যন্ত জনসংখ্যা ৮০.৮৩০ হয়। কয়রায় গড় সাক্ষরতার হার ৭২.২%(৭+ বছর) রয়েছে এবং জাতীয় গড় শিক্ষিত ৭২.২%।[৪]
উপজেলাটি মূলত বাঙালী মুসলমানদের পাশাপাশি একটি খুব বৃহৎ বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায় এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী যেমন মাহাতো এবং মুন্ডা জনগোষ্ঠীর বাসস্থান যারা কয়রা সদর ইউনিয়ন এবং উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নে বসবাস করে । [২]
নদ-নদী
কয়রা উপজেলায় রয়েছে অনেকগুলো নদী। এখানকার নদীগুলো হচ্ছে শিবসা নদী, পশুর নদী, কপোতাক্ষ নদ,বল নদী ও আড়পাঙ্গাশিয়া নদী।[৫][৬]
স্বাস্থ্য
স্বাস্থ্যকেন্দ্র হাসপাতাল ১, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ১, দাতব্য চিকিৎসালয় ১, পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র ২, ক্লিনিক ৮। পানীয়জলের উৎস:- নলকূপ ৪৩.৮২%, ট্যাপ ১.০৮%, পুকুর ৫৪.৯৭% এবং অন্যান্য ০.১৩%। এ উপজেলায় ১৯৯ টি অগভীর নলকূপের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিকের উপস্থিতি প্রমাণিত হয়েছে। স্যানিটেশন ব্যবস্থা:-- এ উপজেলার ৩০.৯৭% (গ্রামে ৩২.৪৩% এবং শহরে ৭.৩৬%) পরিবার স্বাস্থ্যকর এবং ৫৯.৮ু% (গ্রামে ৫৮.০৩% এবং শহরে ৮৮.২৯%) পরিবার অস্বাস্থ্যকর ল্যাট্রিন ব্যবহার করে। ৯.২৪% পরিবারের কোনো ল্যাট্রিন সুবিধা নেই।
শিক্ষা
শিক্ষার হার, গড় হার ৩২.৪%; পুরুষ ৪৩.৬%, মহিলা ২১.৪%।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
- ভি. কে. এস. এ. গিলাবাড়ী পি. জি ইউনাইটেড একাডেমী।
- গ্রাজুয়েটস মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মহারাজপুর,কয়রা।
- কপোতাক্ষ মহাবিদ্যালয় (১৯৮৪)
- আমাদী জায়গীরমহল তাকিমুদ্দীন মাধ্যমিক বিদ্যালয় (১৯৪৪)
- ১নং নাকশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
- জোবেদা খানম কলেজ (১৯৯৬)
- কোমরউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়
- কয়রা মদিনাবাদ হাই স্কুল
- সুন্দরবন মাধ্যমিক বিদ্যালয়
- উত্তর বেদকাশি মাধ্যমিক বিদ্যালয়
- দক্ষিণ বেদকাশি মাধ্যমিক বিদ্যালয়
- কয়রা সরকারী মহিলা কলেজ
- কয়রা ছিদ্দিকীয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসা।
- কয়রা উত্তর চক কামিল মাদ্রাসা।
- কালনা আমিনিয়া কামিল (এম,এ) মাদ্রাসা।
- কয়রা মদিনাবাদ দাখিল মাদ্রাসা
- উত্তর বেতকাশী হাবিবিয়া দাখিল মাদ্রাসা।
- কালনা মহিলা দাখিল মাদ্রাসা।
- কয়রা উত্তর চক মহিলা মাদ্রাসা।
- গোবরা দাখিল মাদ্রাসা
- জয়পুর সিমরাআইট দারুসুন্না দাখিল মাদ্রাসা।
- দেয়ারা অন্তাবুনিয়া দাখিল মাদ্রাসা।
- দাকেন মহেশ্বরিপুর দাখিল মাদ্রাসা।
- চৌকুনি ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা।
- চান্নির চক বি কে দাখিল মাদ্রাসা।
- বেজপারা হায়াতুন্নেছা দাখিল মাদ্রাসা।
- অর্জুনপুর আহসানিয়া দাখিল মাদ্রসা।
- কয়রা অচ্চিন মহিলা দাখিল মাদ্রাসা।
- খোরল মহিলা দাখিল মাদ্রাসা।
- কয়রা মদিনাবাদ দারুসুন্না মহিলা দাখিল মাদ্রাসা।
- এম এ দারুল ইহসান দাখিল মাদ্রাসা।
- এম এম দারুস সুন্না দাখিল মাদ্রাসা।
- নারানপুর মহিলা দাখিল মাদ্রাসা।
- পি কে এস এ আদার্স দাখিল মাদ্রাসা।
- সাতহালিয়া গাউসুল আজম দাখিল মাদ্রাসা।
- সু্ন্দরবন ছিদ্দিকীয়া দাখিল মাদ্রাসা।
- ঘুগরাঘাটি ফাজিল মাদ্রাসা।
- বে সিন মিম বায়লা হারানিয়া আলিম মাদ্রাসা।
- ডি এফ নাকশা আলিম মাদ্রাসা।
- কুশডাঙ্গা আলহাজ্ব কোমর উদ্দীন আলিম মাদ্রাসা।
- চান্নির চক এল সি কলেজিয়েট স্কুল
কৃষি
কয়রার অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। এখানকার অধিকাংশ জমি এক ফসলি। শুধু মাত্র বর্ষা মৌসুমে চাষ হয়। তাছাড়া বিস্তীর্ণ এলাকায় মাছের, প্রধানত চিংড়ি, চাষ হয়। কৃষিভূমির মালিকানা ভূমিমালিক ৬২.৭৬%, ভূমিহীন ৩৭.২৪%। শহরে ৬৩.৫১% এবং গ্রামে ৫০.৭৪% পরিবারের কৃষিজমি রয়েছে। প্রধান কৃষি ফসল ধান, আলু, শাকসবজি। বিলুপ্ত বা বিলুপ্তপ্রায় ফসলাদি তিল, তিসি, কাউন, আখ। প্রধান ফল-ফলাদি: আম, জাম, কলা, কাঁঠাল, নারিকেল, পেঁপে, সুপারি, তরমুজ, লিচু, পেয়ারা, জামরুল, লেবু, । বর্তমানে কয়রা উপজেলায় প্রচুর পরিমাণে তরমুজ উৎপাদন হচ্ছে।
অর্থনীতি
কৃষিই এই উপজেলার অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। এলাকার জনগোষ্ঠীর বড় একটা অংশ সুন্দরবনের উপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল। সুন্দরবন থেকে বছর জুড়ে কাঠ, মাছ, মধু আহরণ অব্যহত থাকে। শিক্ষিত শ্রেনী চাকরি করে। অধিকাংশ লোনা পানির জমিতে ছিঁড়িয়া চাষ করা হয় ৷ মৎস্য খামার বা চিংড়ি ঘের ৩১৩৮, পোনা উৎপাদন খামার ৫, চিংড়ি ডিপো ২৭৩, নার্সারি ৬।
যোগাযোগ
যোগাযোগ বিশেষত্ব পাকারাস্তা ২১ কিমি, আধা-পাকারাস্তা ৮০ কিমি, কাঁচারাস্তা ১৪২ কিমি
এছাড়া বর্তমানে খুলনা-পাইকগাছা-কয়রা সড়কটি প্রশস্ত জেলা মহাসড়কে রূপান্তরের জন্য প্রশস্তকরনের কাজ চলছে ।
উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি
- খান সাহেব কোমর উদ্দিন ঢালী - ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক খানসাহেব উপাধিপ্রাপ্ত ও পাকিস্তান সরকার কর্তৃক সমাজসেবক তমগাহে খেদমত উপাধিপ্রাপ্ত
- শাহ মোহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস - রাজনীতিবিদ[৭][৮]
- রোমান সানা - স্বর্ণপদক বিজয়ী তীরন্দাজ[৯][১০]
দর্শনীয় স্থান ও স্থাপনা
- বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী সুন্দরবন
- ঐতিহাসিক মসজিদকুঁড় ৯ গুম্বুজ মসজিদ
- উত্তর বেদকাশী বড়বাড়ী রাজা প্রতাপাদিত্য এর বাড়ী
- উত্তর বেদকাশীর খালে খাঁর ৩৮ বিঘা দিঘী
- আমাদী বুড়ো খাঁ-ফতে খাঁর দিঘী।
- কাছারী বাড়ি বটবৃক্ষ
- বাঁশখালীবাঁশখালী সৎসঙ্গ মন্দির
- শুড়িখালীশ্রীশ্রী রাম কৃষ্ণ আশ্রম
বিবিধ
হাট( বাজার)
- ঝিলিয়াঘাটা হাট
- হুগলা হাট
- আমাদি হাট
- নাকশা হাট
- ঘড়িলাল হাট
- সুতার হাট
- গুগরোকাটি হাট
- খোড়লকাটি হাট
- জোরসিং বাজার
- কালনা বাজার
- চাঁদ আলী মাছের কাঁটা
এছাড়া এখানে বিভিন্ন মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে দক্ষিণ বেদকাশি বনবিবির মেলা, পদ্মপুকুর রথ মেলা, হরিহরপুর রথ মেলা উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও বিলুপ্ত বা বিলুপ্তপ্রায় সনাতন বাহন পালকি, ঘোড়া ও গরুর গাড়ি এই অঞ্চলে বহুল প্রচলিত।
এছাড়া এখানে বিভিন্ন শিল্প ও কল-কারখানা গড়ে উঠছে। এর মধ্যে চাল কল, তেল কল, ময়দা কল, কাঠ চেরাই কল, বরফ কল ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
আরও দেখুন
তথ্যসূত্র
- ↑ সিটি মেয়রসহ ১ হাজার ৮৭৬ জনপ্রতিনিধিকে অপসারণ
- ↑ সিটি মেয়রসহ ১ হাজার ৮৭৬ জনপ্রতিনিধিকে অপসারণ
- ↑ বাংলাদেশ বাংলাপিডিয়া কয়রা_উপজেলা বাংলাপিডিয়া.
- ↑ Population Census Wing, BBS.
- ↑ ড. অশোক বিশ্বাস, বাংলাদেশের নদীকোষ, গতিধারা, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০১১, পৃষ্ঠা ৩৮৯, টেমপ্লেট:আইএসবিএন।
- ↑ '.
- ↑ ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদে নির্বাচিত মাননীয় সংসদ-সদস্যদের নামের তালিকা বাংলাদেশ সরকার.
- ↑ শাহ্ মো. রুহুল কুদ্দুস
- ↑ এশিয়ান র্যাঙ্কিং আর্চারিতে স্বর্ণ জিতলেন রোমান সানা
- ↑ আর্চারিতে ইতিহাস গড়লেন রোমান সানা