বাংলাদেশ গণপরিষদ

ভিকিটিয়া থেকে

টেমপ্লেট:Infobox legislature

বাংলাদেশ গণপরিষদ হল ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান সরকার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের প্রথম ও এখন পর্যন্ত আয়োজিত একমাত্র সংবিধান সভা[১] উপনিবেশি শাসনের ধারাবাহিকতা অবলম্বনে এই সংবিধান সভাকে গণপরিষদ হিসেবে নামাঙ্কিত করা হয়েছিল।

পাকিস্তানের তদানীন্তন সামরিক শাসক ও রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান কর্তৃক জারিকৃত লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার, ১৯৭০-এর অধীনে নির্বাচনে জয়ী প্রতিনিধিদের নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের গণপরিষদ গঠিত হয়েছিল বলে বহু রাজনৈতিক দলসহ মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, বদরুদ্দীন উমর, আ. স. ম. আবদুর রব, ফরহাদ মজহার ও আরো অনেকে এই সংবিধান সভাকে অবৈধ বলে আখ্যায়িত করেছে।[২][৩][৪] কিন্তু বিতর্ক ও বিরোধিতা সত্ত্বেও শেখ মুজিবের নিরাপস অবস্থানের দরুন এক বছরেরও কম সময়ে গণপরিষদ বাংলাদেশের সংবিধানের খসড়া প্রণয়ন করে তা ১৯৭২ সালের ১৬ই ডিসেম্বরে প্রবর্তন করতে সক্ষম হয়। তবে প্রণয়নকালীন সময় থেকে আজ পর্যন্ত এই সংবিধান বিপুল সমালোচনার মধ্য দিয়ে গেছে। অনেকেই এই সংবিধানকে 'ফ্যাসিবাদী,' স্বৈরতন্ত্রসৃষ্টিকারী বলে অভিহিত করেছেন।[৫][৬][৭]

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার নতুন করে সংবিধান সভা নির্বাচনের পরিকল্পনা করছে।[৮] সেই লক্ষ্যে একটি সংবিধান সংস্কার কমিশনও গঠন করেছে।

গণপরিষদ গঠন

১৯৭২-এর জানুয়ারির ১১ তারিখ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক স্বাক্ষরিত “বাংলাদেশের অস্থায়ী সংবিধান আদেশ, ১৯৭২” জারি করা হয়। এই আদেশ বলে বাংলাদেশের জনগণের অভিপ্রায় অনুসারে সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অবলম্বিত হয় এবং শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। পরে রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাইদ চৌধুরী ১৯৭২ সালের ২৩শে মার্চ গণপরিষদ আদেশ জারি করেন। এবং তা ১৯৭২ সালের ২৬শে মার্চ থেকে কার্যকরী বলে ঘোষিত হয়।

এই আদেশ বলে, ৭ ও ১৭ ডিসেম্বর, ১৯৭০ সালের নির্বাচনের জাতীয় এবং প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত ৪৬৯-এর (জাতীয় পরিষদে ১৬৯ জন আর প্রাদেশিক পরিষদে ৩০০ জন) মধ্যে ৪০৩ জন সদস্য নিয়ে গণপরিষদ গঠিত হয়। ৪০৩ জনের মধ্যে ৪০০ জন সদস্য ছিল আওয়ামী লীগের আর ১ ছিল ন্যাপের আর ২ জন ছিল নির্দলীয়। গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন বসে ১০ এপ্রিল ১৯৭২ সালে। অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ। প্রথম অধিবেশনের শুরুতে শাহ আব্দুল হামিদ স্পীকার ও মোহাম্মদ উল্ল্যাহ ডেপুটি স্পীকার নির্বাচিত হন।[৯]

সংবিধান প্রণয়ন

সংবিধান কমিটি গঠন ও কমিটি কর্তৃক খসড়া প্রণয়ন

১৯৭২ সালের ১১ এপ্রিল গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনে ৩৪ সদস্য বিশিষ্ট “খসড়া সংবিধান-প্রণয়ন কমিটি” গঠিত হয়।[১০][১১] তাঁরা হলেন:

  1. ড. কামাল হোসেন (ঢাকা-৯, জাতীয় পরিষদ)
  2. মো. লুৎফর রহমান (রংপুর-৪, জাতীয় পরিষদ)
  3. অধ্যাপক আবু সাইয়িদ (পাবনা-৫, জাতীয় পরিষদ)
  4. এম আবদুর রহিম (দিনাজপুর-৭, প্রাদেশিক পরিষদ)
  5. এম আমীর-উল ইসলাম (কুষ্টিয়া-১, জাতীয় পরিষদ)
  6. নূরুল ইসলাম মঞ্জুর (বাকেরগঞ্জ-৩, জাতীয় পরিষদ)
  7. আব্দুল মুত্তাকিম চৌধুরী (সিলেট-৫, জাতীয় পরিষদ)
  8. ডা. ক্ষিতীশ চন্দ্র মন্ডল (বাকেরগঞ্জ-১৫, প্রাদেশিক পরিষদ)
  9. সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত (সিলেট-২, প্রাদেশিক পরিষদ)
  10. সৈয়দ নজরুল ইসলাম (ময়মনসিংহ-১৭, জাতীয় পরিষদ)
  11. তাজউদ্দীন আহমদ (ঢাকা-৫, জাতীয় পরিষদ)
  12. খন্দকার মোশতাক আহমেদ (কুমিল্লা-৮, জাতীয় পরিষদ)
  13. এ এইচ এম কামরুজ্জামান (রাজশাহী-৬, জাতীয় পরিষদ)
  14. আবদুল মমিন তালুকদার (পাবনা-৩, জাতীয় পরিষদ)
  15. আবদুর রউফ (রংপুর-১১, ডোমার, জাতীয় পরিষদ)
  16. মোহাম্মদ বায়তুল্লাহ (রাজশাহী-৩, জাতীয় পরিষদ
  17. বাদল রশীদ, বার অ্যাট ল,
  18. খন্দকার আবদুল হাফিজ (যশোর-৭, জাতীয় পরিষদ)
  19. শওকত আলী খান (টাঙ্গাইল-২, জাতীয় পরিষদ)
  20. মো. হুমায়ুন খালিদ
  21. আছাদুজ্জামান খান (যশোর-১০, প্রাদেশিক পরিষদ)
  22. এ কে মোশাররফ হোসেন আখন্দ (ময়মনসিংহ-৬, জাতীয় পরিষদ)
  23. আবদুল মমিন
  24. শামসুদ্দিন মোল্লা (ফরিদপুর-৪, জাতীয় পরিষদ)
  25. শেখ আবদুর রহমান (খুলনা-২, প্রাদেশিক পরিষদ)
  26. ফকির সাহাব উদ্দিন আহমদ
  27. অধ্যাপক খোরশেদ আলম (কুমিল্লা-৫, জাতীয় পরিষদ)
  28. অ্যাডভোকেট সিরাজুল হক (কুমিল্লা-৪, জাতীয় পরিষদ)
  29. দেওয়ান আবু আব্বাছ (কুমিল্লা-৫, জাতীয় পরিষদ)
  30. হাবিবুর রহমান (কুমিল্লা-১২, জাতীয় পরিষদ)
  31. আবদুর রশিদ
  32. নুরুল ইসলাম চৌধুরী (চট্টগ্রাম-৬, জাতীয় পরিষদ)
  33. মোহাম্মদ খালেদ (চট্টগ্রাম-৫, জাতীয় পরিষদ)
  34. রাজিয়া বানু (নারী আসন, জাতীয় পরিষদ)

১৭ এপ্রিলের এই কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কমিটি জনগণের সকল অংশের মতামত ও পরামর্শ গ্রহণের জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জন্য একটি খসড়া সংবিধান প্রণয়নকালে কমিটি কর্তৃক বিবেচনার জন্য যেকোন প্রতিষ্ঠান এবং এই ব্যাপারে আগ্রহী যে কোন ব্যক্তির নিকট হতে লিখিত প্রস্তাব আহ্বান করে।[১২] এইরূপ সকল প্রস্তাব ১৯৭২ সালের ৮ই মের মধ্যে বাংলাদেশ গণপরিষদের খসড়া সংবিধান-প্রণয়ন কমিটির সচিবের নিকট রেজিস্ট্রিকৃত ডাকযোগে পাঠানের অনুরোধ জানায়।

এরপর বিভিন্ন গণমাধ্যম, সংবাদপত্র, বেতার ও টেলিভিশন ইত্যাদির মাধ্যমেও প্রস্তাব পাঠানোর আমন্ত্রণ জানানো হয়। এর ফলে কমিটি ৯৮টি স্মারকলিপি লাভ করে যা কমিটির সদস্যদের কাছে পেশ করা হয়।[১২] এপ্রিলের ১৭ থেকে ২৯ তারিখ পর্যন্ত কমিটির ১৩টি ও মে মাসের ১০ থেকে ২৫ তারিখ পর্যন্ত ১৬টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ২৯টি বৈঠকে প্রতিটি খসড়া বিধান নিয়ে আলোচনা হয় এবং বিভিন্ন দেশের সংবিধান পর্যালোচনা করা হয়।[১২]

বেশীর ভাগ অনুচ্ছেদ ও দফা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত হয়। কিছু ক্ষেত্রে উপস্থিত সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতানুযায়ী সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯৭২-এর মে মাসের ২৫ তারিখে অনুষ্ঠিত কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, খসড়া বিধানাবলী নিয়ে সদস্যগণ যে সব সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, তার ভিত্তিতে সংবিধানের একটি পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রস্তুত করা হবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একটি পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রস্তুত করা হয় এবং জুনের ৩ তারিখে কমিটি বৈঠকে তা উপস্থাপন করা হয়। কমিটি এই খসড়াটি দফাওয়ারী পর্যালোচনা করে জুনের ১০ তারিখে কমিটি কর্তৃক খসড়া সংবিধান অনুমোদিত হয়।

এরপর খসড়া সংবিধানের পাঠ আইনগত খসড়া রচনাকারীদের এবং বাংলা ভাষার পণ্ডিতদের দিয়ে পরীক্ষা করানো হয় ও তাঁদের পরামর্শ অনুযায়ী পরিমার্জিত খসড়া সংবিধানের একটি পাঠ আগস্টের ১০ তারিখ কমিটি বৈঠকে উপস্থিত করা হয়। আগস্টের ১০ থেকে সেপ্টেম্বরের ১ তারিখ এবং সেপ্টেম্বরের ৯ থেকে অক্টোবরের ১১ তারিখ পর্যন্ত কমিটি পুনরায় এই পাঠের পর্যালোচনা করে। কোন কোন বিষয়ে কমিটির ৬ জন সদস্য সংখ্যগরিষ্ঠ মত সমর্থন করেননি এবং মতানৈক্যমূলক মন্তব্য সংযোজন করার অভিপ্রায় জ্ঞাপন করেন। চূড়ান্তরূপে গ্রহণ করার জন্য কমিটি এ বিষয়ে মতানৈক্যমূলক মন্তব্য সংযোজনসহ একটি রিপোর্ট প্রস্তুত করে ও খসড়াটি বাংলাদেশ গণপরিষদে পেশ করার সিদ্ধান্ত নেয়।

খসড়া সংবিধান পেশ

১৯৭২-এর অক্টোবরের ১২ তারিখ গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশনে স্পীকার মোহাম্মদউল্লাহ দিনের ৪ নং কর্মসূচী অনুযায়ী খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সভাপতি কামাল হোসেনকে রিপোর্টসহ খসড়া সংবিধান বিল পেশ করার অনুরোধ করেন। কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত সভাপতি বলেন: টেমপ্লেট:উক্তি

সংবিধানে যেন জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়, সেজন্য খসড়া সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা হয়: টেমপ্লেট:উক্তি

খসড়া সংবিধানে আরো বলা হয় যে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করার উদ্দেশ্যে ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে জাতিসংঘ কতর্ক ঘোষিত “মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র”-এ লিপিবদ্ধ মৌলিক মানবাধিকারসমূহ হুবহু সংরক্ষিত করে এই খসড়ার তৃতীয় ভাগে মৌলিক অধিকার বিধানাবলী সংযোজন করা হয়। আর আইন সভা গঠনের ব্যবস্থা করা হয়েছে অন্যূন আঠারোো বছর বয়স্ক নাগরিকদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে। নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগের ভার অর্পিত হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রিসভার উপর; আর এই মন্ত্রিসভাকে যৌথভাবে সংসদের কাছে দায়বদ্ধ রাখা হয়। আরো ব্যবস্থা করা হয় যে, রাষ্ট্রপতি হবেন সাংবিধানিক প্রধান; তার ক্ষমতা ও পরিধি কি হবে, তা খসড়ায় বিধিবদ্ধ করা হয়। এই খসড়ায় নিরপেক্ষ ও স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক করার ব্যবস্থা করা হয়। সংসদীয় গণতন্ত্রের সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য যে সব পদ ও দপ্তর অপরিহার্য বলে মনে করা হয়, সে সব পদ ও দপ্তর সৃষ্টির ব্যবস্থা করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো এটর্নি-জেনারেল, মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও পরীক্ষকের পদ এবং নির্বাচন কমিশন ও সরকারী কর্ম কমিশন দপ্তর।

হাতেলেখা খসড়া সংবিধান বিল পেশ করার পর গণপরিষদ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কমিটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে তাঁর ভাষণে বলেন: টেমপ্লেট:উক্তি

সংবিধান বিল উত্থাপন প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী ও কমিটির সভাপতি কামাল হোসেন তাঁর বক্তৃতায় বলেন: টেমপ্লেট:উক্তি

সংবিধান-বিলের ওপর সাধারণ আলোচনা

১৯৭২-এর অক্টোবরের ১২ তারিখ বাংলাদেশ গণপরিষদে সংবিধান বিল পেশ করার পর সাত দিন ধরে জাতীয় দৈনিকগুলোতে ধারাবাহিকভাবে খসড়া সংবিধানের পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ করার ব্যবস্থা করা হয়। অক্টোবরের ১৯ তারিখ গণপরিষদে সংবিধান বিষয়ে সাধারণ আলোচনা আরম্ভ হয়। খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সভাপতি কামাল হোসেন এদিন সংবিধান-বিলটি অবিলম্বে বিবেচনার জন্য পরিষদের স্পীকারকে অনুরোধ করেন এবং স্পীকার সংবিধান-বিলটি অবিলম্বে বিবেচনার জন্য পরিষদ সদস্যদের সাধারণ আলোচনার আহ্বান জানান।

সাধারণ আলোচনার শুরুতেই পরিষদের ন্যাপ দলীয় একমাত্র বিরোধী সদস্য সুরঞ্জিৎ সেনগুপ্ত বলেন: টেমপ্লেট:উক্তি

সুরঞ্জিৎ সেনগুপ্তের প্রস্তাবকে সমর্থন করে অতঃপর পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত নির্দলীয় সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা বলেন: টেমপ্লেট:উক্তি

১৯৭২-এর অক্টোবরের ৩০ তারিখ পর্যন্ত সংবিধান-বিলের ওপর সাধারণ আলোচনা অব্যাহত থাকে। সংযোজন-বিয়োজনের পর অতঃপর অক্টোবরের ৩১ তারিখ থেকে সংবিধান-বিল বিবেচনার দফাওয়ারী পাঠ শুরু হয়। গণপরিষদে পেশকৃত খসড়া সংবিধানের প্রতিটি দফা স্পীকার পরিষদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে পাঠ করেন এবং দফাটি সম্পর্কে সদস্যগণের কোনরূপ ভিন্নমত বা সংশোধনী থাকলে সেটা নিয়ে অনুপুঙ্খ আলোচনার পরই কেবল ভোটাভুটির মাধ্যমে তার নিষ্পত্তি বিধান করে দফাটি গৃহীত হয়। এরপর নভেম্বরের ৩ থেকে শুরু হয় দফাওয়ারীভাবে সংবিধান-বিল আলোচনা। একটানা চলে মাঝ রাতের বিরতি দিয়ে পরদিন ৪ তারিখ সকাল ১১-৩০ মিনিটে অধিবেশন পুনরায় আরম্ভ হয়। আলোচনা-পর্যালোচনার সমাপ্তিতে প্রস্তাবনা থেকে শুরু করে চতুর্থ তফসিল পর্যন্ত পৃথক পৃথকভাবে সকল দফা ধ্বনি-ভোটে গৃহীত হয়। কমিটির সভাপতি কামাল হোসেন স্পীকারের অনুমতিক্রমে প্রস্তাব করেন যে, টেমপ্লেট:উক্তি স্পীকার গণপরিষদ সদস্যদের উদ্দেশে কমিটির সভাপতির প্রস্তাবের প্রতিধ্বনি করেন।

নেতা, বিরোধী দলীয় ও নির্দলীয়র বক্তব্য

চূড়ান্তরূপে সংবিধান গৃহীত হওয়ার পূর্বে সংবিধান-বিলের উপর বক্তব্য প্রদান করার অনুমতি চান যথাক্রমে সুরঞ্জিৎ সেনগুপ্ত এবং মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা। ন্যাপ দলীয় গণপরিষদ সদস্য সুরঞ্জিৎ সেনগুপ্ত তাঁর বক্তৃতায় বলেন: টেমপ্লেট:উক্তি

নির্দলীয় সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা তাঁর বক্তৃতায় বলেন: টেমপ্লেট:উক্তি

সংবিধান-বিলটি গৃহীত হওয়ার পূর্বে পরিষদ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বক্তৃতায় বলেন: টেমপ্লেট:উক্তি

গণপরিষদ নেতার নীতি-নির্ধারণী বক্তৃতার পর খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সভাপতি কামাল হোসেন তাঁর বক্তৃতায় বলেন: টেমপ্লেট:উক্তি

সংবিধান-বিল অনুমোদন

কমিটির সভাপতি কামাল হোসেন তাঁর বক্তৃতার সমাপ্তি টেনে বলেন, টেমপ্লেট:উক্তি

সংবিধান বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা-পর্যালোচনা শেষে গণপরিষদের স্পীকার গণপ্রতিনিধিবৃন্দের উদ্দেশে বলেন, টেমপ্লেট:উক্তি প্রস্তাবটি পরিষদে স্থিরীকৃত-আকারে সংবিধান-বিল হিসেবে পাস হয়। এরপর “বিলের প্রস্তাবনা, সংক্ষিপ্ত শিরোনাম, সূচীপত্র, তফসিল, সকল অনুচ্ছেদ, দফা, উপ-দফা, বিষয়বস্তু” সংবিধান-বিলের অংশ বলে নবেম্বর ৪, ১৯৭২-এ ধ্বনি-ভোটে গৃহীত হয়।[১৩] মোট ২১টি অধিবেশনে ২০৮ দিনে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন করা হয়।

হাতেলেখা সংবিধান

১৯৭২-এর ডিসেম্বরের ১২ তারিখ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর গণভবনে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে সাক্ষাৎ করেন ৬ সদস্যের শিল্পীবৃন্দের এক প্রতিনিধি দল। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সভাপতি ও আইনমন্ত্রী কামাল হোসেন। প্রতিনিধি দলের নেতা জয়নুল আবেদিন হাতেলেখা সংবিধানের অনুলিপিটির প্রতিটি পাতায় অঙ্কিত চিত্রগুলো বঙ্গবন্ধুর কাছে উপস্থাপন করেন।

লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাই কমিশনের দ্বিতীয় সচিব, পেশাদার লিপিকর একেএম আবদুর রউফকে সংবিধান হাতে লেখার জন্য লন্ডন থেকে আনা হয়। নকশার কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিল্পীগণ বাংলা-মায়ের নয়ন-মনোহর মনোরম দৃশ্যগুলি চিত্রায়িত করেন। নদী-মেঘলা আকাশ, নৌকাবাইচ, মাঝি-মাল্লা, পাটচাষী, নবান্ন ও কৃষক-শ্রমিক মেহনতী মানুষের জীবনসহ মাতৃভূমির শোভা দলিলে প্রস্ফূটিত করেন শিল্পাচার্য।[১২]

হাতেলেখা সংবিধানে স্বাক্ষর-দান অনুষ্ঠান

বাংলাদেশ গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশনের অষ্টাদশ বৈঠক ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ডিসেম্বর, সকাল ৯টা ১০ মিনিটে স্পীকার মহম্মদুল্লাহর সভাপতিত্বে ঢাকাস্থ পরিষদ ভবনে আরম্ভ হয়। অধিবেশনের শুরুতে সংবিধান কমিটির সভাপতি এবং আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কামাল হোসেন বলেন, টেমপ্লেট:উক্তি এরপর ধ্বনি-ভোটে প্রস্তাবটি গৃহীত হলে স্পীকার দিনের কার্যসূচির দ্বিতীয় দফা অর্থাৎ স্বাক্ষর-দান অনুষ্ঠান শুরু করেন।

এ-পর্যায়ে স্পীকার বলেন, টেমপ্লেট:উক্তি

তখন শেখ মুজিবুর রহমান প্রথমে সংবিধানের বাংলা এবং পরে ইংরেজি পাঠে স্বাক্ষর-দান করেন। এর পর পর যথাক্রমে পরিষদ উপনেতা ও শিল্পমন্ত্রী সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ স্বাক্ষর-দান করার পর অন্য সদস্যবৃন্দ স্বাক্ষর-দান অব্যাহত রাখেন এবং পরদিন ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত তা প্রলম্বিত হয়। ১৫ ডিসেম্বর, ১৯৭২ সকাল ১০টায় পুনরায় অধিবেশন আরম্ভ হয় এবং যেসব সদস্য স্বাক্ষর-দান করেননি তাঁদের স্বাক্ষর-দানের পর স্পীকার স্বাক্ষর-দান অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘোষণা করেন।

গণপরিষদ বিলুপ্তি

হাতেলেখা সংবিধানে স্বাক্ষর-দান শেষ হবার পর পরিষদ নেতা বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতার পর স্পীকার বাংলাদেশ গণপরিষদের সিদ্ধান্ত ও অভিপ্রায় অনুযায়ী জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে রাত বারোটায় (১৬ ডিসেম্বর) পরিষদের বিলুপ্তি ঘোষণা করেন।[১৪]

তথ্যসূত্র

  1. '.
  2. আহমেদ, ফিরোজ (মে ২০১৫)। মুহাম্মদ, আনু, সম্পাদক। "বাংলাদেশের সংবিধান ও রাষ্ট্রের গতিমুখ: সূচনাকাল" (পিডিএফ)সর্বজনকথা। ঢাকা: ৮৬–৯৮। ২০ মে ২০২৪ তারিখে মূল (পিডিএফ) থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৮  এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |সংগ্রহের-তারিখ=, |year= / |date= mismatch (সাহায্য)
  3. '.
  4. '.
  5. Interview: Situation In Bangladesh Challenging, But Happy That A Fascist Rule Has Ended, Cultural Icon Farhad Mazhar To ETV Bharat
  6. আ.লীগের নেতৃত্বে সাংবিধানিক ফ্যাসিবাদী শাসন চলছে: আম্বিয়া
  7. Constitution needs rewriting to bar autocracy
  8. Constituent assembly to be convened for charter reform: Nahid
  9. '.
  10. '.
  11. WE, THE PEOPLE
  12. ১২.০ ১২.১ ১২.২ ১২.৩ সংবিধান প্রণয়ন বার্ষিকী ও প্রাসঙ্গিক কিছু তথ্য
  13. বাহাত্তরের নথিপত্র লাপাত্তা
  14. গণপরিষদে বঙ্গবন্ধুর প্রথম ভাষণ