ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ

ভিকিটিয়া থেকে

টেমপ্লেট:Infobox organization ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (সংক্ষেপে: ডাকসু হিসেবে পরিচিত) হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ। এটি ১৯২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ' নামে প্রতিষ্ঠিত হয়।[১][২] পরবর্তীতে ১৯৫৩ সালে গঠনতন্ত্র সংশোধনের মাধ্যমে পূর্বনাম পরিবর্তন করে বর্তমান নাম 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ' গ্রহণ করা হয়।

গঠনতন্ত্র

উপাচার্যকে সভাপতি এবং ১৬ জন ছাত্র প্রতিনিধি থেকে ১০ জন কর্মকর্তা নির্বাচনের ব্যবস্থা রাখা হয়, কোষাধাক্ষের দায়িত্ব পালন করেন একজন শিক্ষক। ২০১৯ সালে সংশোধিত গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, পদাধিকারবলে ডাকসুর সভাপতি উপাচার্যসহ এর নির্বাহী কমিটি হবে ২৫ সদস্যবিশিষ্ট।[৩] ১৯৭৩ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশে ডাকসুর কথা বলা হয়েছে৷[৪] আর ডাকসুর গঠনতন্ত্রে বলা হয়েছে, প্রতি বছর ডাকসু নির্বাচন হবে৷[৪] কীভাবে হবে, কাদেরকে নিয়ে হবে, সেগুলো বিস্তারিত বলা আছে গঠনতন্ত্রে৷ বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ছাত্র সংসদ আছে৷ সেখানেও সরাসরি ভোটে ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার বিধান রয়েছে৷[৪]

ইতিহাস

প্রতিষ্ঠা থেকে ১৯৯০

১৯২২ সালের ১লা ডিসেম্বর কার্জন হলে অনুষ্ঠিত শিক্ষকদের একটি সভায় ১৯২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ' নামে একটি ছাত্র সংসদ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়।[১] ১৯২৩ সালের ১৯শে জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন নির্বাহী পরিষদ পূর্বোল্লিখিত শিক্ষক সভার সিদ্ধান্তকে অনুমোদন দেয়।[১] ১৯২৫ সালের ৩০ অক্টোবর সংসদের সাধারণ সভায় খসড়া গঠনতন্ত্র অনুমোদন করা হয়। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী পরিষদ অনুমোদন করলে তা কার্যকর হয়। প্রথমবার ১৯২৪-২৫ সালে সম্পাদক ছিলেন যোগেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত, পরের বছর অবনীভূষণ রুদ্র। ১৯২৯-৩০ সালে সম্পাদক নির্বাচিত হন আতাউর রহমান খান।[৫]

পরবর্তীতে ১৯৫৩-৫৪ শিক্ষাবর্ষে গঠনতন্ত্র সংশোধনের মাধ্যমে পূর্বনাম পরিবর্তন করে বর্তমান নাম 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ' গ্রহণ করা হয়।[৫] বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ডাকসুর সহসভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন থেকে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন মাহবুবুর জামান।[৬] সর্বশেষ ১৯৯০-৯১ সেশনের জন্য সহসভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে যথাক্রমে নির্বাচিত হন ছাত্রদলের আমানউল্লাহ আমানখায়রুল কবির খোকন[৭] ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ১৯৯০ পর্যন্ত ৩৬ বার নির্বাচন হয়েছে।

১৯৯০ থেকে বর্তমান

ডাকসুতে ক্ষমতাসীন দল বিরোধী ছাত্রসংগঠন জয়ী হতে পারে—এই আশঙ্কা থেকে ৯০ পরবর্তী সরকারগুলো এ নির্বাচন অনুষ্ঠানে অনীহ ছিল।[৮] উপাচার্য একে আজাদ চৌধুরী ডাকসু নির্বাচনের উদ্যোগ নিলেও নানা মহলের চাপ ও বাধায় শেষ পর্যন্ত নির্বাচন আর হয়নি।[৯] নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার বয়স ও সুযোগ না থাকায় ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনগুলোর বড় নেতাদেরও অনাগ্রহ ছিল।[৮] ক্যাম্পাসে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে নির্বাচন অনুষ্ঠানের অর্থবহ কোনো উদ্যোগ নেয়নি সরকার–ঘনিষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় ও হলগুলোয় ক্রমে ক্রমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সরকারি দলের ছাত্রসংগঠনের একক আধিপত্য।[৮] ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফাহমিদুল হক বলেন, 'ছাত্র সংসদ না থাকায় মাস্তানতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়।[১০]

২০২৫ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের’ প্যানেল বিজয়ী হয়। সহসভাপতি (ভিপি) পদে সাদিক কায়েম এবং সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে এসএম ফরহাদ নির্বাচিত হন।[১১]

জাতীয় রাজনীতিতে ভূমিকা

৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে পরবর্তীতে ৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণ অভ্যুত্থান, ৭১-এর স্বাধীন বাংলাদেশ নির্মাণের লক্ষ্যে রক্তক্ষয়ী জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম এবং পরবর্তীতে ৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনে সাহায্য করেছে ঢাবি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ।[১২][৯][১৩] ডাকসুর নেতৃবৃন্দের সাহসী ও বলিষ্ঠ উদ্যোগে ১৯৭১ সালের ২রা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক বটতলায় প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়।[১৪]

ডাকসু ভিপি ও জিএস তালিকা

ক্রম সেশন সহ সভাপতি (ভিপি) ছাত্র সংগঠন জেনারেল সেক্রেটারি (জিএস) ছাত্র সংগঠন
০১ ১৯২৪-২৫ মমতাজ উদ্দিন আহমেদ যোগেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত
০২ ১৯২৫-২৬ মমতাজ উদ্দিন আহমেদ এ কে মুখার্জি (ভারপ্রাপ্ত এ বি রুদ্র)
০৩ ১৯২৭-২৮ বি কে অধিকারী
০৪ ১৯২৮-২৯ এএম আজহারুল ইসলাম এস চক্রবর্তী
০৫ ১৯২৯-৩০ রমণী কান্ত ভট্টাচার্য কাজী রহমত আলী ও আতাউর রহমান
০৬ ১৯৩২-৩৩ ভবেশ চক্রবর্তী
০৭ ১৯৩৩-৩৪ ভবেশ চক্রবর্তী
০৮ ১৯৩৫-৩৬ এ এইচ এম এ কাদের
০৯ ১৯৩৬-৩৭ এ এইচ এম এ কাদের
১০ ১৯৩৮-৩৯ আব্দুল আওয়াল খান
১১ ১৯৪১-৪২ আব্দুর রহিম
১২ ১৯৪৫-৪৬ আহমদুল কবির (ভারপ্রাপ্ত ফরিদ আহমেদ) সুধীর দত্ত
১৩ ১৯৪৬-৪৭ ফরিদ আহমেদ সুধীর দত্ত
১৪ ১৯৪৭-৪৮ অরবিন্দ বোস গোলাম আযম ছাত্র ইউনিয়ন
১৫ ১৯৫৩-৫৪ এস. এ. বারী জুলমত আলী খান (ভারপ্রাপ্ত ফরিদ আহমেদ)
১৬ ১৯৫৪-৫৫ নিরোদ বিহারী নাগ আব্দুর রব চৌধুরী
১৭ ১৯৫৫-৫৬ নিরোদ বিহারী নাগ আব্দুর রব চৌধুরী
১৮ ১৯৫৬-৫৭ একরামুল হক শাহ আলী হোসেন
১৯ ১৯৫৭-৫৮ বদরুল আলম ফজলী হোসেন
২০ ১৯৫৮-৫৯ আবুল হোসেন এ টি এম মেহেদী
২১ ১৯৫৯-৬০ আমিনুল ইসলাম তুলা আশরাফ উদ্দিন মকবুল ছাত্র ইউনিয়ন
২২ ১৯৬০-৬১ বেগম জাহানারা আক্তার অমূল্য কুমার
২৩ ১৯৬১-৬২ এস এম রফিকুল হক এনায়েতুর রহমান
২৪ ১৯৬২-৬৩ শ্যামাপ্রসাদ ঘোষ কে এম ওবায়েদুর রহমান ছাত্রলীগ
২৫ ১৯৬৩-৬৪ রাশেদ খান মেনন ছাত্র ইউনিয়ন মতিয়া চৌধুরী ছাত্র ইউনিয়ন
২৬ ১৯৬৪-৬৫ বোরহানউদ্দিন ছাত্র ইউনিয়ন আসাফউদ্দৌলা
২৭ ১৯৬৬-৬৭ ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী ছাত্রলীগ শফি আহমেদ
২৮ ১৯৬৭-৬৮ মাহফুজা খানম ছাত্র ইউনিয়ন মোরশেদ আলী ছাত্র ইউনিয়ন
২৯ ১৯৬৮-৬৯ তোফায়েল আহমেদ ছাত্রলীগ নাজিম কামরান চৌধুরী
৩০ ১৯৭০-৭১ আ স ম আবদুর রব ছাত্রলীগ আব্দুল কুদ্দুস মাখন ছাত্রলীগ
৩১ ১৯৭২-৭৩ মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ছাত্র ইউনিয়ন মাহবুব জামান ছাত্র ইউনিয়ন
৩২ ১৯৭৯-৮০ মাহমুদুর রহমান মান্না জাসদ ছাত্রলীগ আখতারুজ্জামান বাসদ ছাত্রলীগ
৩৩ ১৯৮০-৮১ মাহমুদুর রহমান মান্না জাসদ ছাত্রলীগ আখতারুজ্জামান বাসদ ছাত্রলীগ
৩৪ ১৯৮২-৮৩ আখতারুজ্জামান বাসদ ছাত্রলীগ জিয়া উদ্দীন আহমেদ বাবলু বাসদ ছাত্রলীগ
৩৫ ১৯৮৯-৯০ সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ ছাত্রলীগ মুশতাক হোসেন
৩৬ ১৯৯০-৯১ আমানউল্লাহ আমান ছাত্রদল খায়রুল কবির খোকন ছাত্রদল
৩৭ ২০১৯-২০ নুরুল হক নুর সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ গোলাম রব্বানী ছাত্রলীগ
৩৮ ২০২৫-২৬ সাদিক কায়েম ছাত্রশিবির এস এম ফরহাদ ছাত্রশিবির

ডাকসু সংগ্রহশালা

ডাকসু সংগ্রহশালার প্রদর্শনী কক্ষ ও দর্শনার্থী

ডাকসুর একটি সংগ্রহশালা রয়েছে। ডাকসুর সমস্ত স্মৃতিচিহ্ন এবং এ দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষিত রয়েছে ডাকসু সংগ্রহশালায়। ১৮৮৩ সাল থেকে এ দেশের মুদ্রা, দুর্লভ আলোকচিত্র, পুস্তক, কোলাজ পদ্ধতির পোস্টার, পত্রিকা কাটিং, ভাষা শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র ইত্যাদি ইতিহাসের উপাদান সংরক্ষিত আছে এখানে। এটিকে অনেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের 'মিনি জাদুঘর' হিসেবে অভিহিত করে। ১৯৯২ সালের ৭ জানুয়ারি ডাকসু ভবনের নিচতলায় একটি কক্ষে যাত্রা শুরু করে এটি। এখানে প্রবেশের আগে চোখে পড়ে ভবনের দেয়ালে অাঁকা ভাষা শহীদদের ম্যুরাল 'চেতনায় একুশ'। ভেতরে আছে বিভিন্ন সময়ের ছাত্র নেতা, রাজনীতিবিদ, শহীদ, শিক্ষাবিদ, দার্শনিকদের ছবি। সংগ্রহশালার এক কোনায় রয়েছে ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক আমতলার আমগাছের ধ্বংসাবশেষ। কক্ষের ভেতরে আছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি। এখানে রয়েছে ৩৫ জন ভাষাসৈনিকের মুদ্রিত সাক্ষাৎকার, ভাষা আন্দোলনকেন্দ্রিক ২৯টি পোস্টার, ভাষাসৈনিকদের ১৫টি আলোকচিত্র, মুক্তিযুদ্ধের তথ্যসংবলিত ছবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিভিন্ন ঐতিহাসিক মুহূর্তের আলোকচিত্র, প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের ব্যানার, ফেস্টুন, পোস্টার, প্রচারপত্র, স্মারকলিপি ইত্যাদি।[১৫]

টীকা

টেমপ্লেট:Notelist

তথ্যসূত্র

বহিঃসংযোগ