দক্ষিণ আফ্রিকা
দক্ষিণ আফ্রিকা হলো আফ্রিকা মহাদেশের সর্বদক্ষিণে অংশে অবস্থিত একটি দেশ। এর পূর্ণ নাম হচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র।
ভৌগোলিক পরিচিতি
দক্ষিণে এর উপকূলে রয়েছে ভারত মহাসাগর এবং দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগর। এদের মিলিত তটরেখা প্রায় ২,৮০০ কিমি। উত্তরে আছে নামিবিয়া, বতসোয়ানা, জিম্বাবুয়ে; পূর্বে মোজাম্বিক ও ইসোয়াতিনি (সোয়াজিল্যান্ড)। এছাড়া মধ্যেই রয়েছে ছোটো লেসোথো দেশটি। দেশের মোট আয়তন প্রায় ১২.২১ লক্ষ বর্গকিমি—বাংলাদেশের আয়তনের প্রায় ৮.৫ গুণ।
জনসংখ্যা ও প্রশাসন
এখানে ৫.৮ কোটি লোকে বাস করে। তাই এটি বিশ্বের ২৪তম সর্বাধিক জনসংখ্যার দেশ।জনঘনত্ব খুব কম, প্রতি বর্গকিমি মাত্র ৪২ জন। তিনটি রাজধানী আছে:
- নির্বাহী: প্রিটোরিয়া (তশোয়ানে)
- আইন বিভাগীয়: কেপ টাউন
- বিচার বিভাগীয়: ব্লুমফন্টেইন (মানগাউং)
সর্ববৃহৎ শহর: জোহানেসবার্গ; এছাড়া বড় শহর: ডারবান, পোর্ট এলিজাবেথ। দেশটি পরিচালিত হয় একাধিক দলের দ্বিকাক্ষিক আইনসভা ও একজন রাষ্ট্রপতি দ্বারা।
ভূ–আকৃতি
সারি–সারি বিস্তৃত মাঝভূমি রয়েছে; এই মালভূমি একদিকে পার্বত্য অঞ্চল এস্কার্পমেন্ট ও উপকূলীয় সমভূমি দ্বারা সীমাবদ্ধ।
- দেশের সর্বোচ্চ পর্বতমালা হলো ড্রাকেন্সবার্গ পর্বতশ্রেণী।
- পশ্চিমে রয়েছে কালাহারি মরুভূমি ও নামিব মরুভূমি।
- প্রধান নদী: অরেঞ্জ নদী ও লিম্পোপো নদী।
- জলবায়ু নাতিশীতোষ্ণ-উপক্রান্তীয়, মাঝে মাঝে শুষ্ক হয়ে খরা দেখা যায়।
প্রাকৃতিক সম্পদ ও উদ্ভিদ–জীবজগত
মাটিতে রয়েছে সোনা, কয়লা, হীরা, প্লাটিনাম ও ভ্যানাডিয়াম। অল্প কিছু বনের মধ্যে রয়েছে নদীতীরবর্তী এবং পার্বত্য এলাকায়। বন্যপ্রাণীর মধ্যে দেখা যায়: সিংহ, হাতি, গণ্ডার, জলহস্তী, চিতাবাঘ, কৃষ্ণসার হরিণ – প্রধানত উদ্যানে। বড় অঙ্গ: বিক্ষিপ্ত বৃক্ষরাজি ও তৃণভূমি (মন্দ "ভেল্ড")। দক্ষিণ-পশ্চিমে রয়েছে ফুলের গাছ, পশ্চিমে ঝোপঝাড়, এবখ কিছু অরণ্য।
মানুষ ও সংস্কৃতি
জনসংখ্যার ৮০% কৃষ্ণাঙ্গ বান্টু আর তাদের শ্রেণি: জুলু, খোসা, সোথো ও তসোয়ানা। বাকিরা: শ্বেতাঙ্গ (৮%), মিশ্র জাতি (৯%) ও ভারতীয় (২%)। স্থানীয় ভাষা সবচেয়ে বেশি: আফ্রিকান্স, ইংরেজি এবং অন্যান্য বান্টু ভাষা। মোট মিলিয়ে ১১টি সরকারি ভাষা আছে। ধর্ম: প্রধানত খ্রিস্টধর্ম, এছাড়াও বৈদিক এবং ইসলাম ধর্ম রয়েছে।
অর্থনীতি
এটি একটি উন্নয়নশীল দেশ এবং আঞ্চলিকভাবে শক্তিশালী। বিশ্বের মধ্যে এটির মান মানব উন্নয়ন সূচকে ১১৩তম। আফ্রিকার মধ্যে ৭ম। জিডিপি এর দিক থেকে এটি আফ্রিকার দ্বিতীয় এবং বিশ্বের ৩৩তম অর্থনীতি। মুদ্রা নাম দক্ষিণ আফ্রিকান র্যান্ড। তাদের প্রধান খাত ব্যাংকিং, পর্যটন, খনিজ উত্তোলন ও শিল্প। তাদের কৃষিতে ফল, শস্য ও পশুপালন—বিশেষ করে ভুট্টা, গম, আখ, কমলা, আলু, আঙুর।
ইতিহাস
প্রাগৈতিহাসিক পর্যায়
দক্ষিণ আফ্রিকায় অনেক পুরনো জীবাশ্ম ও প্রাচীন বস্তু পাওয়া গেছে। Gauteng Provinceএর গুহাগুলোতে অনেক জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। এই এলাকা ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় আছে।
এই দেশে প্রথম যারা বসবাস করত, তাদের বলা হয় স্যান। পরে খৈ খৈ এবং বান্টু ভাষাভাষীরা আসে। তারা আফ্রিকার অন্য জায়গা থেকে এখানে চলে আসে। ১৫০০ খ্রিস্টাব্দে কেপ সাগরপথ আবিষ্কৃত হয়। এর প্রায় ১৫০ বছর পর, ১৬৫২ সালে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এখানে বিশ্রামের জায়গা বানায়। এই জায়গাটিই পরে কেপটাউন শহরে পরিণত হয়। তখন এখানে জোনা ও জুলু সম্প্রদায় থাকত।
এরপর ইউরোপ থেকে আরও লোকজন এসে কেপটাউনে বসতি স্থাপন করে। তবে ১৭৯৫ সালের আগ পর্যন্ত তাদের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৫,০০০। তখন কিছু ইউরোপীয় লোক মিলে একটি প্রজাতন্ত্র গড়ার চেষ্টা করে। তারা ছিল হল্যান্ড, জার্মানি ও ফ্রান্স থেকে আসা। কিন্তু পরে ব্রিটিশরা শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং ১৮০৬ সালে কেপটাউন দখল করে নেয়। ১৮১৫ সালে নেপোলিয়নের যুদ্ধ শেষে ব্রিটিশরা পুরো এলাকায় নিয়ন্ত্রণ নেয়। তারা আরও ৫,০০০ মানুষ এনে বসতি স্থাপন করে। ইউরোপীয় বাকি লোকজনকে তারা উত্তর ও পূর্ব আফ্রিকায় পাঠিয়ে দেয়। তারা সেখানে ট্রান্সভাল ও অরেঞ্জ ফ্রি স্টেট নামে দুইটি প্রজাতন্ত্র গঠন করে।
১৮৬৭ সালে সেখানে হীরা পাওয়া যায়, আর ৯ বছর পরে সোনা খুঁজে পাওয়া যায়। তখন অনেক বাইরের লোক সেখানে আসে। কেপ কলোনির প্রধানমন্ত্রী সেসিল রোডস চান পুরো এলাকা একসাথে করতে। এ নিয়ে স্থানীয় লোকজন ও ব্রিটিশদের মধ্যে লড়াই হয়। ১৯০২ সালে ব্রিটিশরা জয়ী হয়। এরপর তারা দেশকে কিছুটা স্বায়ত্তশাসন দেয়। ১৯১০ সালে ইউনিয়ন অব সাউথ আফ্রিকা গঠিত হয়। এটি গঠিত হয় দুইটি প্রাক্তন প্রজাতন্ত্র ও কেপ ও নাটাল উপনিবেশ নিয়ে। লুইস বোথা হন প্রথম প্রধানমন্ত্রী। এরপর ১৯১২ সালে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস গঠিত হয় এবং আফ্রিকানদের রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু হয়।
প্রজাতন্ত্র (১৯৬১–বর্তমান)
৩১ মে ১৯৬১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র হয়। তখন কেবল শ্বেতাঙ্গরা ভোট দিতে পারত। রাষ্ট্রপতি হতেন কিন্তু তার তেমন ক্ষমতা থাকত না। চার্লস রবার্ট স্মর্ট, জিম ফৌচে এবং মারাইস ভিলজেন ছিলেন এমন কয়েকজন রাষ্ট্রপতি। পি. ও. যথা ১৯৮৩ সালে সংবিধান পরিবর্তন করে রাষ্ট্রপতির হাতে অনেক ক্ষমতা দেন এবং তিনি নিজেই রাষ্ট্রপতি হন। পরে এফ. ডব্লিউ. ডি ক্লার্ক রাষ্ট্রপতি হন।
১৯৯৪ সালে প্রথমবারের মতো সবাই ভোট দিতে পারে, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে। নেলসন ম্যান্ডেলা-র নেতৃত্বে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস বড় জয় পায় এবং এখনও তারা সরকারে আছে।
রাজনীতি
দক্ষিণ আফ্রিকার রয়েছে তিনটি রাজধানী শহর। তিনটির মধ্যে সবচেয়ে বড় কেপটাউন আইনসভার রাজধানী। প্রিটোরিয়া প্রশাসনিক ও ব্লোয়েমফন্টেইন বিচারিক রাজধানী। দক্ষিণ আফ্রিকার পার্লামেন্ট দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। উচ্চকক্ষের নাম ন্যাশনাল কাউন্সিল অব প্রভিন্সেস যা ৯০ জন সদস্য নিয়ে গঠিত হয়। নিম্নকক্ষ ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির সদস্য ৪০০। নিম্নকক্ষের সদস্যরা জনসংখ্যার ভিত্তিতে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে নির্বাচিত হন। অর্ধেক সদস্য নির্বাচিত হন জাতীয় তালিকা থেকে, আর অর্ধেক প্রাদেশিক তালিকা থেকে। উচ্চকক্ষ গঠিত হয় প্রত্যেক প্রদেশ থেকে দশজন সদস্য নিয়ে। এ ক্ষেত্রে জনসংখ্যার তারতম্য বিবেচ্য নয়। প্রতি পাঁচ বছর পর নির্বাচন হয়। নিম্নকক্ষে সরকার গঠিত হয় এবং ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হন প্রেসিডেন্ট। ১৯৯৪ সালে বর্ণবাদ বিলুপ্তির পর থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার রাজনীতিতে একচ্ছত্র প্রাধান্য বজায় রেখেছে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস বা এএনসি। তবে বর্ণবাদ চালু করেছিল যে ন্যাশনাল পার্টি, সেটার পুনর্গঠিত সংগঠন নিউ ন্যাশনাল পার্টি ২০০৫ সালের এপ্রিলে এএনসি’র সাথে একীভূত হয়ে যায়। ২০০৯ সালের নির্বাচনে এএনসি থেকে বেরিয়ে যাওয়া কংগ্রেস অব পিপল শতকরা ৭ দশমিক ৪ ভাগ এবং জুলু ভোটারদের প্রতিনিধিত্বকারী ইনকাথা ফ্রিডম পার্টি শতকরা ৪ দশমিক ৬ ভাগ ভোট পেয়েছে। এএনসি’র প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স পেয়েছে শতকরা ১৬ দশমিক ৭ ভাগ ভোট। ফলে এএনসি’র ভোটের পরিমাণ শতকরা ৭০ ভাগেই রয়ে গেছে, যা প্রথম থেকে ছিল।
প্রশাসনিক অঞ্চলসমূহ
| নাম | জনসংখ্যা | আয়তন (বর্গ কিমি) | রাজধানী | বৃহত্তম শহর |
|---|---|---|---|---|
| গুটেং | ১২,২৭২,২৬৩ | ১৮,১৭৮ | জোহানেসবার্গ | জোহানেসবার্গ |
| কয়াজুলু-নাটাল | ১০,২৬৭,৩০০ | ৯৪,৩৬১ | পিটারমারিজবুর্গ | ডারবান |
| পূর্ব কেপ | ৬,৫৬২,০৫৩ | ১৬৮,৯৬৬ | ভিশো | পোর্ট এলিজাবেথ |
| পশ্চিম কেপ | ৫,৮২২,৭৩৪ | ১২৯,৪৬২ | কেপ টাউন | কেপ টাউন |
| নর্থ ওয়েস্ট | ৩,৫৯৭,৬০০ | ১০৪,৮৮২ | রুস্তেনবুর্গ |
ভূগোল
অর্থনীতি

কেপটাউন এ দেশের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র। জাতিসঙ্ঘের শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী দক্ষিণ আফ্রিকা একটি মধ্য আয়ের দেশ। এখানে রয়েছে প্রচুর সম্পদ। তেমনি এখানকার অর্থ আইন, যোগাযোগ, জ্বালানি ও যাতায়াতব্যবস্থা বেশ উন্নত। এখানকার স্টক এক্সচেঞ্জটি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশটির একটি। ২০০৭ সালে জিডিপি’র দিক দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার অবস্থান ছিল ২৫তম। তবে বেকারত্বের হার অনেক বেশি এবং আয়ের বৈষম্য ব্রাজিলের প্রায় সমান। দক্ষিণ আফ্রিকা এ মহাদেশের সবচেয়ে বড় জ্বালানি উৎপাদনকারী ও ব্যবহারকারী দেশ। পর্যটনের জন্য দেশটি খুব প্রসিদ্ধ এবং রাজস্বের উল্লেখযোগ্য অংশ আসে পর্যটন খাত থেকে। আফ্রিকার দেশগুলো ছাড়াও দক্ষিণ আফ্রিকার বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, চীন,জাপান, যুক্তরাজ্য ও স্পেনের সাথে। প্রধান রফতানি দ্রব্য খাদ্যশস্য, হীরক, ফল, স্বর্ণ, ধাতব ও খনিজ দ্রব্য, চিনি ও উল। আমদানির এক-তৃতীয়াংশজুড়ে থাকে যন্ত্রপাতি ও যানবাহন। অন্যান্য আমদানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে কেমিক্যাল সামগ্রী, উৎপাদিত পণ্য ও পেট্রোলিয়াম।
সংস্কৃতি
সমাজ ও সংস্কৃতি দক্ষিণ আফ্রিকার বাসিন্দাদের নৃতাত্ত্বিক বৈচিত্র্যের কারণে এখানে কোনো একক সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। খাদ্যের বৈচিত্র্যই পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণের বিষয়। দক্ষিণ আফ্রিকার কালো বাসিন্দারা এখনো বেশির ভাগই বাস করে গ্রামে। এরা প্রায়ই দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটায়। অবশ্য বর্তমানে প্রচুরসংখ্যক কালো মানুষ শহুরে হয়ে উঠছে। ফলে ঐতিহ্যগত সংস্কৃতি থেকে তারা পশ্চিমা সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকছে। শহুরে লোকরা ইংরেজিতে কথা বলে। তবে তাদের নিজস্ব ভাষাও রয়েছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রায় পুরোটা শ্বেতাঙ্গ। ইদানীং কালোরা তাতে যুক্ত হচ্ছে দ্রুতগতিতে। তেমনি অশ্বেতাঙ্গ ও ভারতীয় বা এশীয়রাও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
আরও দেখুন
তথ্যসূত্র
বহিঃসংযোগ
- দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার
- রাষ্ট্র প্রধান এবং মন্ত্রিপরিষদ সদসবৃন্দ
- South Africa from UCB Libraries GovPubs
- SouthAfrica.info ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ৩ জানুয়ারি ২০১৩ তারিখে