সিলেট বিভাগ
সিলেট বিভাগ বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একটি প্রশাসনিক বিভাগ। এটি দেশের অন্যতম প্রাচীন এবং ঐতিহ্যবাহী বিভাগ, যা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, চা বাগান, পাহাড়ি এলাকা এবং শাহজালাল ও শাহ পরান (রহ.) এর মাজারের জন্য পরিচিত। সিলেট বিভাগে ৪টি জেলা রয়েছে।[১]
| সিলেট বিভাগ | |
|---|---|
|
|
|
| বিভাগীয় সদরদপ্তর-এর ছবি (সিলেট বিভাগ) | |
| প্রতিষ্ঠার তারিখ | ১৯৯৫ |
| বিভাগীয় কমিশনার | খান মোঃ রেজা-উন-নবী |
| সংসদীয় আসন | ১৯ টি (সিলেট: ০৬টি; সুনামগঞ্জ :০৫টি ; মৌলভীবাজার: ০৪টি; হবিগঞ্জ: ০৪টি) |
| মোট আয়তন | ১২,৫৫৮ (বার হাজার পাঁচশত আটান্ন) বর্গকিমি |
| মোট জনসংখ্যা | ১,১০,৩৪,৮৬৩ |
| জেলা সংখ্যা | ৪টি |
| উপজেলা সংখ্যা | ৪১টি |
| সময় অঞ্চল | জিএমটি +৬ (GMT+6) |
| ইউটিসি অফসেট | +৬:০০ |
| প্রধান নদী | সুরমা, কুশিয়ারা, কালনী ও যাদুকাটা |
| প্রধান শহর | সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ |
| পরিবহন ব্যবস্থা | সড়ক পথ, আকাশ পথ ও রেল পথ |
| ওয়েবসাইট | https://www.sylhetdiv.gov.bd/ |
ইতিহাস
সিলেট বিভাগ গঠনের ইতিহাস দীর্ঘ এবং ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর সঙ্গে জড়িত। ১৭৭২ সালের ১৭ মার্চ সিলেট জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৭৪ সাল পর্যন্ত এটি ঢাকা বিভাগের অন্তর্ভুক্ত ছিল। একই বছর সিলেটকে নবগঠিত আসাম প্রদেশের অংশ করা হয়। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় গণভোটের মাধ্যমে সিলেট জেলা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হয়। এই সময় সিলেট চট্টগ্রাম বিভাগের আওতাধীন ছিল। ১৯৮৩-৮৪ সালে বৃহত্তর সিলেট জেলা ভেঙে ৪টি নতুন জেলা (সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ) গঠিত হয়। ১৯৯৫ সালে বৃহত্তর সিলেটের এই চারটি জেলা নিয়ে সিলেট বিভাগ গঠিত হয়। এটি দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একটি স্বতন্ত্র প্রশাসনিক বিভাগ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সিলেট বিভাগের প্রথম বিভাগীয় কমিশনার ছিলেন মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান। সিলেট বিভাগের ইতিহাসে এ অঞ্চল তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, চা-বাগান, হাওর অঞ্চল এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের জন্য বিখ্যাত।[২]
সিলেট নামের উৎপত্তি
সিলেট নামের উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন মতবাদ রয়েছে। গৌড়ের রাজা গুহক তার কন্যা শীলাদেবীর নামে ‘শীলাহাট’ স্থাপন করেন, যা থেকে ‘সিলট’ বা ‘সিলেট’ নামের উৎপত্তি হতে পারে। হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, সতীদেবীর দুটি হাড় সিলেটে পড়েছিল। তার অপর নাম ‘শ্রী’, তাই ‘শ্রী + হড্ড’ থেকে ‘শ্রীহট্ট’ নামটি এসেছে। ৬৪০ খ্রিস্টাব্দে হিউয়েন সাং তার ভ্রমণ বিবরণীতে সিলেটকে ‘শি-লি-চা-ত-ল’ বলেন। আল্ বেরুনীর ‘কিতাবুল হিন্দ’ গ্রন্থে এটি ‘সীলাহেত’ নামে উল্লেখিত। ইংরেজ শাসনে, কাছাড়ের সদর স্টেশন ‘Silchar’ থেকে পার্থক্য করতে ‘Sylhet’ নামটি চালু হয়। এভাবেই সিলেট নামটি প্রতিষ্ঠিত হয়।[২]
ভৌগোলিক বিবরণ
অবস্থান
সিলেট বিভাগ ২৩°৫৮´উত্তর অক্ষাংশ থেকে ২৫°১২´উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯০°৫৬´পূর্ব দ্রাঘিমাংশ থেকে ৯২°৩০´পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত। এর সীমানা:
- উত্তরে: ভারতের মেঘালয় রাজ্য।
- দক্ষিণে: ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য ও বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা।
- পূর্বে: ভারতের আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্য।
- পশ্চিমে: নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলা।
আয়তন
সিলেট বিভাগের মোট আয়তন ১২,৫৫৮ বর্গ কিলোমিটার। জেলার ভিত্তিতে আয়তন:
- সিলেট জেলা: ৩,৪৫২ বর্গ কিলোমিটার।
- সুনামগঞ্জ জেলা: ৩,৬৭০ বর্গ কিলোমিটার।
- মৌলভীবাজার জেলা: ২,৭৯৯ বর্গ কিলোমিটার।
- হবিগঞ্জ জেলা: ২,৬৩৭ বর্গ কিলোমিটার।
আয়তনের দিক থেকে সুনামগঞ্জ জেলা সর্ববৃহৎ এবং হবিগঞ্জ জেলা সর্বক্ষুদ্র।
ভূপ্রকৃতি
সিলেট বিভাগের উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে উঁচু পর্বতশ্রেণীর পাহাড়ি অঞ্চল বিদ্যমান। মেঘালয়, খাসিয়া, জৈন্তিয়া, ও ত্রিপুরা পাহাড় এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সীমানা তৈরি করেছে। অভ্যন্তরীণ এলাকা মূলত সমতল, যেখানে রয়েছে ছোট ছোট টিলা ও জঙ্গল।
প্রশাসনিক বিবরণ
- জেলা: ৪টি
- সংসদীয় আসন: ১৯টি।
- উপজেলা: ৪১টি।
- থানা: ৪৪টি।
- সীমান্তবর্তী উপজেলা: ১৯টি।
স্থানীয় সরকার
- সিটি কর্পোরেশন: ১টি (সিলেট সিটি কর্পোরেশন)।
- পৌরসভা: ২০টি।
- ইউনিয়ন: ৩৩৮টি।
জনসংখ্যা
সিলেট বিভাগ বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক অঞ্চল। ২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, সিলেট বিভাগের মোট জনসংখ্যা ১,১০,৩৪,৮৬৩ জন। এর মধ্যে গ্রামীণ জনসংখ্যা ৮৯,৬৩,৬৩৯ জন (৮১.২৩%) এবং শহুরে জনসংখ্যা ২০,৬৫,১২৩ জন (১৮.৭৭%)। সিলেট বিভাগের জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ৮৭৩ জন।
বিভাগীয় জনসংখ্যা (জেলা অনুযায়ী)
- সিলেট জেলা: ৩৮,৫৭,০৩৭ জন
- সুনামগঞ্জ জেলা: ২৬,৯৫,৪৯৫ জন
- মৌলভীবাজার জেলা: ২১,২৩,৪৪৫ জন
- হবিগঞ্জ জেলা: ২৩,৫৮,৮৮৬ জন
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি
সিলেট বিভাগে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির বসবাস রয়েছে, যার মধ্যে প্রধানতম হল:
- মনিপুরি
- খাসিয়া
- গারো
- পাত্র
- লুসাই
- হাজং
- সাওতাল
- ত্রিপুরা
- টিপরা
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির জনসংখ্যা
সিলেট বিভাগে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির মোট জনসংখ্যা ১,৩৬,৫৯৪ জন, যা বিভাগীয় মোট জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ।
- সিলেট জেলা: ১৬,৪৫,৮৫৮ জন
- সুনামগঞ্জ জেলা: ৫,২৮,৫৭ জন
- মৌলভীবাজার জেলা: ৭৩,২৮৮ জন
- হবিগঞ্জ জেলা: ৪১,৫৩,৬৮০ জন
সিলেট বিভাগের জনসংখ্যা বৈচিত্র্যময়, যেখানে শহর ও গ্রামাঞ্চলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির উপস্থিতি বিভাগের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বৈচিত্র্যকে প্রতিফলিত করে।
উল্লেখযোগ্য পর্যটন কেন্দ্র
- সিলেট জেলা: হযরত শাহজালাল (রঃ) ও শাহপরাণ (রঃ) এর মাজার, জাফলং, রাতারগুল।
- সুনামগঞ্জ জেলা: টাঙ্গুয়ার হাওর, হাছন রাজার বাড়ি।
- মৌলভীবাজার জেলা: মাধবকুন্ড জলপ্রপাত, লাউয়াছড়া উদ্যান।
- হবিগঞ্জ জেলা: সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি
- সিলেট জেলা: জেনারেল এম এ জি ওসমানীর কবর।
- সুনামগঞ্জ জেলা: ডলুরা স্মৃতিস্তম্ভ।
- মৌলভীবাজার জেলা: বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান মেমোরিয়াল টাওয়ার।
- হবিগঞ্জ জেলা: তেলিয়াপাড়া স্মৃতিসৌধ।
সিলেট বিভাগের নদনদী|উল্লেখযোগ্য নদী
- সিলেট অঞ্চল: সুরমা, কুশিয়ারা, সারি।
- সুনামগঞ্জ অঞ্চল: কালনী, সুরমা, যাদুকাটা।
- মৌলভীবাজার অঞ্চল: মনু, ধলাই।
- হবিগঞ্জ অঞ্চল: খোয়াই, সুতাং।
হাওর
জনসংখ্যা ও অর্থনীতি
সিলেট বিভাগ একটি জনবহুল এবং বৈদেশিক আয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। এখানকার অধিকাংশ মানুষ প্রবাসী রেমিট্যান্সের উপর নির্ভরশীল। চা শিল্প এবং হাওর অঞ্চলের কৃষি এই বিভাগের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য
সিলেটের সংস্কৃতি তার বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্য এবং বাউল গান ও লোকসংগীতের জন্য পরিচিত। এখানে সুফি ধারার প্রভাব এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সহাবস্থান লক্ষ্য করা যায়।
পরিবহন
সিলেট বিভাগে রেল, সড়ক, এবং বিমানপথে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সাথে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে। ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর।[৩]
আরও পড়ুন
তথ্যসূত্র
- ↑ https://bn.banglapedia.org/index.php/%E0%A6%B8%E0%A6%BF%E0%A6%B2%E0%A7%87%E0%A6%9F_%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%97
- ↑ ২.০ ২.১ https://www.sylhetdiv.gov.bd/bn/site/page/a8xo-%E0%A6%8F%E0%A6%95-%E0%A6%A8%E0%A6%9C%E0%A6%B0%E0%A7%87-%E0%A6%B8%E0%A6%BF%E0%A6%B2%E0%A7%87%E0%A6%9F-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%97
- ↑ https://www.caab.gov.bd/airports/osmani
